ঢাকা ১২:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
টার্গেট কিলিংয় আতঙ্ক: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়, বিচারহীনতার দায় কার ? কমলনগরে স্ত্রীর ভিডিও প্রকাশ নিয়ে বিরোধ, কিল-ঘুষি দিয়ে বৃদ্ধকে হত্যার অভিযোগ রুমিনের অভিযোগ নিয়ে যা বলেন ওসি মনজুর কাদের, আগের স্টেশনের কান্ডকীর্তি ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি,যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন আন্দোলনের হুংকার দিবেন না, হুংকার দিয়ে লাভ নেই,রাজপথ থেকে উঠা আসা দল বিএনপি: পানি সম্পদমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি লক্ষ্মীপুরে সারের ৫৭ ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী, বাদ পড়লেন পুরোনো ব্যবসায়ীরা লং মার্চ-রোড মার্চ করে সমাজে অশান্তির চেষ্টা করবেন, সেটা হতে দেয়া হবেনা: পানি সম্পদমন্ত্রী কাঁচাবাজারে আগুন: ‘জীবন এখন এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ, একাধিক কেনার সামর্থ্য নাই’ বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক পা হারায়: রায়পুরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি -বধির আবদুল মান্নানের মাতবেতর জীবন-যাপন

লক্ষ্মীপুরে সম্পত্তি লিখে নিতে বৃদ্ধ বাবাকে বন্দি রেখে নির্যাতন, উদ্ধার করলো পুলিশ

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ০৫:০৮:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
  • 87

তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সম্পত্তি লিখে নিতে মিলন হোসেন (৪৬) নামের এক ব্যক্তিকে তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে ও ছেলের স্ত্রীরা মিলে ৩দিন ঘরে বন্দি রেখে অমানবিক নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মারধরে ওই বৃদ্ধের দুই পা ভেঙে গেছে এবং ঘাড়ের হাড্ডি মারাত্মক জখম হয়েছে। অবশেষে স্থানীয় সাংবাদিক ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় মুমূর্ষু অবস্থায় বৃদ্ধকে উদ্ধার করে সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরে রামগতি উপজেলার চর বাদাম ইউনিয়নের চরসীতা গ্রামে ভুক্তভোগী মিলনের বসতঘরে বর্বরোচিত এই ঘটনা ঘটেছে।

গ্রামবাসী জানান, জমি লিখে দিতে রাজি না হওয়ায় বৃদ্ধ অসহায় মিলনকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। টানা তিন দিন কোনো চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে বসতঘরের একটি গোপন কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। ব্যথার তীব্রতায় পুরো শরীর ফুলে গিয়ে এক পায়ের জখমস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করলেও মন গলেনি পাষণ্ড স্ত্রী ও সন্তানদের। বদ্ধ ঘরের অন্ধকার থেকে ক্ষুধার জ্বালায় আর এক ফোঁটা পানির জন্য মিলন বারবার আকুতি করলেও কেউ সাড়া দেয়নি, উল্টো সবাই মিলে ঘরের দরজা আটকে পাশের শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করত।

শনিবার খুবই ভোরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায় করে মিলনকে লক্ষ্মীপুরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক্স-রে করার পর চিকিৎসকেরা জানান তাঁর দুই পা-ই ভেঙে গেছে। কিন্তু অমানবিক নির্যাতন করার পরেও স্ত্রী পান্না আক্তার স্বামীকে হাসপাতালের বেডে না পাঠিয়ে সোজা নিয়ে যান একটি ভূমি অফিসে। সেখানে মিলনের মুমূর্ষু অবস্থা দেখে কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দেন এই অবস্থায় কোনো দলিল হবে না। জমি রেজিস্ট্রি করতে ব্যর্থ হয়ে মিলনকে আবারও বাড়িতে এনে সেই গোপন কক্ষে তালা মেরে আটকে রাখা হয় বলে স্থানীয় একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে ঘটনার তিনদিন পর রোববার বিকেলে গোপন সংবাদ পেয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা মিলনের বাড়িতে হাজির হন। প্রথমে বাইরে থেকে ঘরে তালাবদ্ধ থাকলেও সাংবাদিকদের কৌশলী অবস্থানের কারণে একপর্যায়ে মিলনের স্ত্রী পান্না বেগম তালা খুলতে বাধ্য হন।  ঘরের ভেতর ঢুকতেই চোখ চড়কগাছ হয়ে যায় সবার। এসময় অন্ধকার একটি কক্ষে প্রায় মৃত অবস্থায় যন্ত্রণায় কাতরানো অবস্থায় দেখা যায় মিলনকে।

এসময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধ মিলন গণমাধ্যমেকর্মীদের জানান, মারধরের সময় তিনি স্ত্রীর পা ধরে বাঁচানোর আকুতি করেছিলেন। কিন্তু স্ত্রী উল্টো ছেলেদের হাতে আরও মোটা লাঠি তুলে দিয়েছিলেন। নিজের বাপদাদার বাড়ি ছেড়ে স্ত্রীর কথায় সারাটা জীবন শশুর বাড়ি এলাকায় থেকে গেছেন। সেখানে জমি ক্রয় করেছেন। কোটি টাকা খরচ করে সন্তানদের জন্য পাঁকা ঘর নির্মাণ করেছেন। এখন সে স্ত্রী ও সন্তানরাই তাকে মেরে ফেলতে চাইছে বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। তিনি বলেন, ওরা আমার মোবাইলটাও কেঁড়ে নিয়েছে। আত্মীয় স্বজনদের কাউকে জানাতেও দেয়নি। আপনারা আমাকে বাঁচান, হাসপাতালে নিয়ে যান, আপনারা চলে গেলে ওরা আমাকে মেরেই ফেলবে।

এদিকে, মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে স্ত্রী পান্না বেগম জানান, তার স্বামী পরনারীর প্রতি আসক্ত এবং মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়।একপর্যায়ে ছেলেরা জানতে পেরে রাগের মাথায় মারধর করেছে। তবে ছেলেরা এতোটা বেশি মারবে তা তিনি বুঝতে পারেননি। তবে সম্পত্তি লিখে নেয়ার কথা স্বীকার করেননি তিনি।

একইভাবে বাবার পরকীয়ার বিষয়ে একাধিকবার নিষেধ করলেও তা না শোনায় ক্ষিপ্ত হয়ে বাবাকে মারার কথা স্বীকার করের সোহাগ বলেন, আমরা মেরেছি এবং আমরাই তার চিকিৎসা করাবো। আপনারা চলে যান।

এঘটনা জানান পরই তাৎক্ষনিক রামগতি থানার এসআই মজিবরের নেতৃত্বে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মূমুর্ষ অবস্থায় মিলনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। এসময় পুলিশ আসার সংবাদে অভিযুক্ত দুই ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।

রামগতি থানার ওসি লিটন দেওয়ান বলেন, ভিকটিমকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, সাংবাদিক ও পুলিশ সঠিক সময়ে না আসলে হয়তো ওই বৃদ্ধ ঘরেই বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হতো।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

টার্গেট কিলিংয় আতঙ্ক: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়, বিচারহীনতার দায় কার ?

লক্ষ্মীপুরে সম্পত্তি লিখে নিতে বৃদ্ধ বাবাকে বন্দি রেখে নির্যাতন, উদ্ধার করলো পুলিশ

আডেট সময় ০৫:০৮:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সম্পত্তি লিখে নিতে মিলন হোসেন (৪৬) নামের এক ব্যক্তিকে তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে ও ছেলের স্ত্রীরা মিলে ৩দিন ঘরে বন্দি রেখে অমানবিক নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মারধরে ওই বৃদ্ধের দুই পা ভেঙে গেছে এবং ঘাড়ের হাড্ডি মারাত্মক জখম হয়েছে। অবশেষে স্থানীয় সাংবাদিক ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় মুমূর্ষু অবস্থায় বৃদ্ধকে উদ্ধার করে সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরে রামগতি উপজেলার চর বাদাম ইউনিয়নের চরসীতা গ্রামে ভুক্তভোগী মিলনের বসতঘরে বর্বরোচিত এই ঘটনা ঘটেছে।

গ্রামবাসী জানান, জমি লিখে দিতে রাজি না হওয়ায় বৃদ্ধ অসহায় মিলনকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। টানা তিন দিন কোনো চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে বসতঘরের একটি গোপন কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। ব্যথার তীব্রতায় পুরো শরীর ফুলে গিয়ে এক পায়ের জখমস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করলেও মন গলেনি পাষণ্ড স্ত্রী ও সন্তানদের। বদ্ধ ঘরের অন্ধকার থেকে ক্ষুধার জ্বালায় আর এক ফোঁটা পানির জন্য মিলন বারবার আকুতি করলেও কেউ সাড়া দেয়নি, উল্টো সবাই মিলে ঘরের দরজা আটকে পাশের শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করত।

শনিবার খুবই ভোরে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায় করে মিলনকে লক্ষ্মীপুরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক্স-রে করার পর চিকিৎসকেরা জানান তাঁর দুই পা-ই ভেঙে গেছে। কিন্তু অমানবিক নির্যাতন করার পরেও স্ত্রী পান্না আক্তার স্বামীকে হাসপাতালের বেডে না পাঠিয়ে সোজা নিয়ে যান একটি ভূমি অফিসে। সেখানে মিলনের মুমূর্ষু অবস্থা দেখে কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দেন এই অবস্থায় কোনো দলিল হবে না। জমি রেজিস্ট্রি করতে ব্যর্থ হয়ে মিলনকে আবারও বাড়িতে এনে সেই গোপন কক্ষে তালা মেরে আটকে রাখা হয় বলে স্থানীয় একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে ঘটনার তিনদিন পর রোববার বিকেলে গোপন সংবাদ পেয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা মিলনের বাড়িতে হাজির হন। প্রথমে বাইরে থেকে ঘরে তালাবদ্ধ থাকলেও সাংবাদিকদের কৌশলী অবস্থানের কারণে একপর্যায়ে মিলনের স্ত্রী পান্না বেগম তালা খুলতে বাধ্য হন।  ঘরের ভেতর ঢুকতেই চোখ চড়কগাছ হয়ে যায় সবার। এসময় অন্ধকার একটি কক্ষে প্রায় মৃত অবস্থায় যন্ত্রণায় কাতরানো অবস্থায় দেখা যায় মিলনকে।

এসময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধ মিলন গণমাধ্যমেকর্মীদের জানান, মারধরের সময় তিনি স্ত্রীর পা ধরে বাঁচানোর আকুতি করেছিলেন। কিন্তু স্ত্রী উল্টো ছেলেদের হাতে আরও মোটা লাঠি তুলে দিয়েছিলেন। নিজের বাপদাদার বাড়ি ছেড়ে স্ত্রীর কথায় সারাটা জীবন শশুর বাড়ি এলাকায় থেকে গেছেন। সেখানে জমি ক্রয় করেছেন। কোটি টাকা খরচ করে সন্তানদের জন্য পাঁকা ঘর নির্মাণ করেছেন। এখন সে স্ত্রী ও সন্তানরাই তাকে মেরে ফেলতে চাইছে বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। তিনি বলেন, ওরা আমার মোবাইলটাও কেঁড়ে নিয়েছে। আত্মীয় স্বজনদের কাউকে জানাতেও দেয়নি। আপনারা আমাকে বাঁচান, হাসপাতালে নিয়ে যান, আপনারা চলে গেলে ওরা আমাকে মেরেই ফেলবে।

এদিকে, মারধরের বিষয়টি স্বীকার করে স্ত্রী পান্না বেগম জানান, তার স্বামী পরনারীর প্রতি আসক্ত এবং মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়।একপর্যায়ে ছেলেরা জানতে পেরে রাগের মাথায় মারধর করেছে। তবে ছেলেরা এতোটা বেশি মারবে তা তিনি বুঝতে পারেননি। তবে সম্পত্তি লিখে নেয়ার কথা স্বীকার করেননি তিনি।

একইভাবে বাবার পরকীয়ার বিষয়ে একাধিকবার নিষেধ করলেও তা না শোনায় ক্ষিপ্ত হয়ে বাবাকে মারার কথা স্বীকার করের সোহাগ বলেন, আমরা মেরেছি এবং আমরাই তার চিকিৎসা করাবো। আপনারা চলে যান।

এঘটনা জানান পরই তাৎক্ষনিক রামগতি থানার এসআই মজিবরের নেতৃত্বে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মূমুর্ষ অবস্থায় মিলনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। এসময় পুলিশ আসার সংবাদে অভিযুক্ত দুই ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।

রামগতি থানার ওসি লিটন দেওয়ান বলেন, ভিকটিমকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, সাংবাদিক ও পুলিশ সঠিক সময়ে না আসলে হয়তো ওই বৃদ্ধ ঘরেই বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হতো।