তাবারক হোসেন আজাদ: লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ ৫ টি উপজেলার সরকারি হাসপাতাল ঘিরে তৈরি হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স মালিক-চালকদের সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের আওতাভুক্ত না হলে কোনো চালক রোগী আনা-নেওয়া করতে পারে না। বিশেষ করে জরুরি ভিত্তিতে রোগী বহনকারী অনেক অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে রোগী আনতে পারলেও নিয়ে যেতে পারে না। এতে চরম বিপদে পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের যে সিন্ডিকেট রয়েছে, তাদের কাছে রোগীরা জিম্মি হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় কোনো রোগী নিয়ে স্বজনরা লক্ষ্মীপুর- চাঁদপুরসহ ঢাকায় যেতে চাইলে চালকদের অ্যাম্বুলেন্সেই তাদের যেতে বাধ্য করা হয়। সিন্ডিকেটের কারণে রোগীকে বাড়তি টাকাও গুনতে হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চান রোগী ও তাদের স্বজনরা। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স বাড়াতে বলেন। এছাড়াও রায়পুর সরকারি হাসপাতালের গেইটের সামনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ১৫-২০টির মত অ্যাম্বুলেন্স রাখা হয়। এতে মানুষ চলাচলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। চালকদের মারামারি, চুরি ও বখাটেপনা দূর করাসহ শৃংখলা রাখতে ১০জন করে সশস্র আনসার নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
কেস স্টাডি :
বৃহস্পতিবার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মুমূর্ষু এক রোগীকে রায়পুর সরকারি হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি নেন স্বজনরা। উদ্দেশ্য রাজধানীর-পঙ্গু হাসপাতাল। অ্যাম্বুলেন্স থামল। কিন্তু রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরকষাকষিও করছিলেন দুই চালক। এক পর্যায়ে ‘হাসপাতাল আঙিনা থেকে কেউ রোগী নিতে পারবেন না’ বলে দুই জনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করতেও চাপ দিতে থাকেন তারা। এসময় চালক যেতে দেরি করলে হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে এক চালকের পক্ষ নিয়ে মারমুখী আচরণ করতে থাকেন। দ্রুত চলে না গেলে অক্ষত অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যেতে পারবে না বলে শাসান। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার সন্ধার পর।
এই প্রতিবেদক বিষয়টি জানতে চাইলে এক রুগীর অভিভাবক অভিযোগ করেন, রায়পুর বা সদর হাসপাতাল বলেন, ভাড়া নিয়ে প্রায় সময় গরিব রোগীর অভিভাবকদের নাজেহাল হতে হয়। দুরুত্বে ভাড়া নিয়ে রায়পুর ও সদর হাসপাতালের সামনে ঝগড়া ও মারামারও হয়। এখানকার (হাসপাতাল আঙিনা) অ্যাম্বুলেন্স মালিক-চালক সিন্ডিকেটের বাধায় সম্ভব হচ্ছে না। এক চালক বলেন কয়েকজন চালক ভাড়া নিয়ে গাদ্দারি করে। মাঝে মাঝে খালি অ্যাম্বুলেন্স নিয়েই ফিরে যাই বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে রুগী তুলে নিয়ে যেতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু রায়পুর হাসপাতালই নয়, জেলার সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কেন্দ্র করেই এমন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বাইরে থেকে আসা কোনো অ্যাম্বুলেন্স ফিরতি ট্রিপে হাসপাতালের রোগী নিতে দেন না চালকরা। হাসপাতাল আঙিনায় দাঁড়াতেও দেন না। নিজেদের অ্যাম্বুলেন্সে যেতে রোগীদের বাধ্য করেন। ইচ্ছামতো ভাড়া নিলেও কেউ কিছু বলছেনা।
চালক-মালিকদের কথা :
জেলা ও রাজধানীকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্সচালকরা বলছেন আবার ভিন্নকথা। সরকারি হাসপাতালের ভেতরে কিছু সময়ের জন্য রাখা হয়। ভাড়া নিয়ে চালকরা মারামারি করে থাকে। সামনের দিকে এভুল আর করবে না। তারা জানান, বর্তমানে এক লিটার অকটেন ১২৫, প্রতি লিটার ডিজেল ১২০, সিএনজি ৪৩, এলপিজি ৬৫ এবং ৫ লিটার মবিল ২৪০০ থেকে ৩৪০০ টাকা। এক জোড়া নতুন চাকার দাম ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। চাকা মেরামত, এয়ার, মোবিল, এসি, অক্সিজেন ফিল্টারসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ মাসে ২০ হাজার। এর বাইরে চালক-সহকারীর থাকা-খাওয়া, মাসিক বেতন ও ওভারটাইম দিতে হয়। ফলে বাইরের অ্যাম্বুলেন্সকে হাসপাতাল রোগী নিতে দেয়া না।
অন্যদিকে জেলা-উপজেলা অ্যাম্বুলেন্সচালকরা অভিযোগ করেন, ঢাকায় বা অন্য জেলায় রোগী নিয়ে গেলেও খালি হাতে ফিরতে হয়। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী না থাকলেও সড়ক-মহাসড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, টানেল ও এক্সপ্রেসওয়েতে টোল (পথশুল্ক) দিতে হয়। ফলে তারা চাইলেও ভাড়ার অঙ্ক কমাতে পারেন না। দিনশেষে রোগীদের পকেট থেকেই এই টাকা যায়।
অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিআরটিএ-এর নিবন্ধনভুক্ত অ্যাম্বুলেন্স ৮ হাজারের মতো। এর মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে আছে প্রায় ২ হাজার। লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর ও সদর সহ পাঁচ উপজেলায় আছে প্রায় দেড়- দুই’শটি।
অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস খসড়া নীতিমালা-২০২৩ অনুযায়ী কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত অ্যাম্বুলেন্সে মহানগরীর মধ্যে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া সর্বোচ্চ ৬০০ টাকার কথা উল্লেখ আছে। মহানগরীর বাইরে প্রথম দুই কিলোমিটারে ভাড়া সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ৬০ টাকা। কিন্তু এই খসরা নীতিমালার কথা কেউ মানছে না।
লক্ষ্মীপুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারন সম্পাদক মোঃ রাসেল চৌধুরী বলেন, আমাদের অ্যাম্বুলেন্স যেমন উপজেলায় বা জেলায় বা ঢাকাসহ যেকোন হাসপাতালে রোগী নিবে, তেমনিভাবে হাসপাতাল থেকে রোগী পরিবহণেরও অধিকার রাখে। কিন্তু একটি সিন্ডিকেটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া উচিত। দেশে প্রয়োজনের দশভাগের একভাগ অ্যাম্বুলেন্স আছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেগুলো আছে সেগুলোর অর্ধেকই অকেজো বা অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। সিন্ডিকেট যার সুযোগ নিচ্ছে। তাই রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত ও আইসিইউ সংবলিত অ্যাম্বুলেন্স বাড়ান দরকার। অ্যাম্বুলেন্সে টোল ফ্রি করা, বিএআরটিএ কর্তৃক আট সিট অনুমোদন এবং অকটেন, সিএনজির দাম কমানো জরুরি। তাতে ভাড়ার অঙ্ক কমবে।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বসহারুল আলম বলেন, অনেকবার বিষয়টা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। দশ জন আনসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ভেতরে বাইরের কোন অ্যাম্বুলেন্স থাকতে পারবেনা বলা হয়। তাদের জন্য ব্যাবস্থা করতে হবে। ভাড়া নিয়ে প্রায় সময় চালকদের মধ্যে ঝগড়া হয়। বিআরটিএ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নীতিমালা-২০২৩ খসড়া তৈরি হলেও গেজেট হয়নি। নির্ধারিত ভাড়ায় রোগী পরিবহণ নিশ্চিত করা দরকার।
লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অ্যাম্বুলেন্স। যেটি সরকারি এবং বেসরকারিভাবে রয়েছে। দুঃখজনক হলো, সরকারি-বেসরকারি চালক ও মালিকদের মধ্যে সমন্বয় নেই। সরকারের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল ও জায়গায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা রাখা। যাতে রোগীরা সহজে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সুষ্ঠু নীতিমাল করতে হবে। মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য কী পরিমাণ অ্যাম্বুলেন্স দরকার, তার বেজলাইন সার্ভে করতে হবে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে রোগীদের সরকারি-বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কাছে জিম্মি থাকতে হবে।
মেঘনার তীর 



















