তাবারক হোসেন আজাদ: প্রায় এক বছর আগে স্থানীয় এক প্রবাসীর মাধ্যমে কাতারের এক ব্যাবসায়ী এই দৃষ্টি নন্দন জামে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তার পাশেই মসজিদের টয়লেট। তার পাশেই তৈরি করা হয় ইমামের থাকার ঘর। যে ব্যাক্তিই নামাজ পড়তে যান নিতিই বলেন, কাজটি ভাল হয়নি, আহ- বলে নিঃশ্বাস ফেলে স্থান ত্যাগ করেন।
জামে মসজিদটি হলো-লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দক্ষিন চরবংশী ইউপির চর কাচিয়া গ্রামের খলিফার হাট এলাকার এলকেএইচ উপকুলীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে বায়তুল নুর জামে মসজিদ। ১৯৯৫ সালে এ মসজিদটি দীর্ঘদিন টিনশেড থাকার পর ২০২৪ সালে মসজিদটি পাকা ও দৃষ্টিনন্দন করা হয়। তার ডান পাশেই আধুনিক অজুখানা এবং টাইলসের টয়লেটও। তবে মসজিদের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব মানবিক বেদনা-এই মসজিদের ইমামকে এখনো বসবাস করতে হচ্ছে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে, ফুটো চুঁইয়ে বর্ষায় বৃষ্টির পানি পড়ে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের পাশেই সুন্দরভাবে নির্মিত পাকা টয়লেট ও অজুখানা। কিন্তু তার ঠিক পাশেই টিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি কক্ষ। সেটিই ইমাম কারী নাজমুল হোসেনের থাকার জায়গা। মরিচাধরা টিনের চালের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র থাকায় বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। বিছানা, কাপড়-চোপড় ও প্রয়োজনীয় বইপত্র ভিজে যায়। রাতভর কখনো এক কোণে, কখনো আরেক কোণে সরে গিয়ে সময় কাটাতে হয় তাঁকে।
ইমাম কারী নাজমুল হোসেন জানান, প্রায় তিন বছর ধরে তিনি এ মসজিদে ইমামতি করছেন। তিনি রায়পুর কামিল মাদ্রাসায় অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। মসজিদ থেকে মাসিক বেতন পান মাত্র ৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রাইভেট পড়ানো ও একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে সব মিলিয়ে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। সেই আয়ের মধ্য থেকেই প্রতি মাসে পরিবারের জন্য প্রায় ১০ হাজার টাকা পাঠাতে হয়। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। ছোট বোন নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে এবং আরেক বোনের বিয়ে হয়েছে।
তিনি বলেন, মসজিদের দায়িত্ব পালন করতে আমার কোনো কষ্ট নেই। কিন্তু বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি চলে আসে। বেশি বৃষ্টি হলে বিছানা ভিজে যায়, বইপত্র নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। অনেক সময় রাত জেগে কাটাতে হয়। শুধু একটি নিরাপদ থাকার জায়গা হলে দায়িত্ব পালন আরও স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারতাম। এর আগে আরও খারাপ জায়গায় ছিলাম। একদিন ঘরের ভেতরে সাপ ঢুকে পড়েছিল। পরে এখানে টিন দিয়ে ঘরটি করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, জুমার দিনে এ মসজিদে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। সুন্দর মসজিদ ও আধুনিক টয়লেট নির্মাণে সবাই আনন্দিত। তবে যিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরিচালনা করেন, শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেন এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর বাসস্থান এখনো টিনের ঘরে-এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
তাদের ভাষ্য, একটি মসজিদের সৌন্দর্য শুধু দৃষ্টিনন্দন ভবনে নয়, বরং সেই মসজিদের খাদেম ও ইমামের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত। একজন ইমাম যদি নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে বসবাস করতে না পারেন, তাহলে সেটি সমাজের জন্যও লজ্জার বিষয়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুরুল আমিন বিএসসি বলেন, বিদেশি অনুদানে মসজিদের মূল ভবন নির্মাণ হয়। ইমামের জন্য একটি ভালো আবাসন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আমরা উপলব্ধি করছি। অর্থের ব্যবস্থা হলে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা বলছেন, ইসলামে ইমাম ও আলেমদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে অনেক জায়গায় দেখা যায়, মসজিদের অবকাঠামো উন্নত হলেও ইমামদের আবাসনের বিষয়টি অবহেলিত থেকে যায়।
চর কাচিয়া খলিফার হাট বায়তুল নুর জামে মসজিদের এই চিত্র যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। মুসল্লিদের জন্য আধুনিক টয়লেট নির্মাণ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে যিনি প্রতিদিন মানুষের ইবাদতের নেতৃত্ব দেন, তাঁর মাথার ওপর যদি ফুটো টিনের ছাউনি থাকে, তাহলে উন্নয়নের সেই চিত্র পূর্ণতা পায় না।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও দানশীল মানুষ এগিয়ে এসে ইমামের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক আবাসন নির্মাণে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।
মেঘনার তীর 



















