ঢাকা ০৭:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত লক্ষ্মীপুরে নকল ঘির ডিলারকে লাখ টাকা জরিমানা : ৩৫০ কেজি ঘি ধ্বংস লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিককে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় ৬জনকে আসামী করে থানায় মামলা, দুই মামলায় গ্রেফতার সন্ত্রাসী সাকিব  দীপ্ত টিভির সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা, বাহিনী প্রধান সাকিবকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে একই পরিবারের তিনজন নিহত রায়পুরে মাদকাসক্ত যুবকের দেয়া আগুনে পুড়ে গেছে ১১টি বসতঘরসহ৬ দোকান,অভিযুক্তকে গনপিটুনি উৎসাহ-উদ্দীপনায় শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী উদযাপিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ :স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জাতীয়তাবাদের নতুন রাজনীতি সৃষ্টি করেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: পানিসম্পদমন্ত্রী

কমলনগরে জেলা পরিষদের খেয়াঘাট ইজারাদারের নৈরাজ্য ‘মুক্তার সিন্ডিকেটের’ গলাকাটা টোল আদায়

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ১০:৩৯:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • 92

শাহরিয়ার কামাল: লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আওতাধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাটে টোল আদায়ের নামে চরম নৈরাজ্য চলছে| মুক্তার হোসেন নামে জেলা পরিষদের এক খেয়াঘাট ইজারাদার সিন্ডিকেট তৈরি করে বেপরোয়া এ অনিয়ম করে যাচ্ছেন| অভিযোগ রয়েছে, মুক্তারের সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদী কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা বিভিন্ন ব্যবসার মালিকসহ স্থানীয় জনসাধারণ এখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন|

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার চরকালকিনি এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের ছেলে মুক্তার হোসেন লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের আওতাধীন ভোলা-লক্ষ্মীপুর (নৌ-রুট) খেয়াঘাট গত ১ জুলাই থেকে এক বছরের জন্য ইজারা নেন| ইজারার শর্ত অনুযায়ী খেয়া নৌকায় যাত্রী পারাপার ও মালামাল পরিবহন থেকে তিনি নির্ধারিত হারে টোল আদায় করবেন| কিন্তু ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে তিনি কয়েকগুণ লাভে স্থানীয় কাদির,আক্তার, মানিক ও শাহজাহান নামে চার ব্যক্তির কাছে খেয়া ঘাটটি সাব-ইজারা দিয়ে দেন| শুধু তাই নয়, জেলা পরিষদের খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে তিনি দখলে নেন বিআইডব্লিউটিএ’র আওতাধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট দু’টি| মুক্তার হোসেন চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় মুদি ব্যবসা করার সুবাধে বিআইডব্লিউটিএ’র কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। ওই সুম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট দু’টির ইজারা প্রক্রিয়াও পণ্ড করে দেন| ফলে শুধুমাত্র খেয়া ঘাটের ইজারা নিয়ে কৌশলে ঘাটের পুরো নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি|

জানা গেছে, মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট ইজারা প্রদানের জন্য বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় দরপত্র আহ্বান করলে আগ্রহী ব্যক্তিরা তৎপরতা শুরু করেন| মুক্তার সেই প্রক্রিয়াকে পণ্ড করতে ঘাট দু’টি বিআইডব্লিউটিএ’র আওতাভুক্ত নয় দাবি করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং-৪৪২২/২৬) দায়ের করেন| আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ৬ মাসের জন্য ইজারা প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দেন| যে কারণে, সরকারি রাজস্ব আদায় সমুন্নত রাখতে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ দু’জন শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তাকে খাস কালেকশনের দায়িত্ব দিয়ে ঘাটে পাঠায়| মো. তোফাজ্জল হোসেন ও মো. শামীম আল শাকিব নামের ওই দুই কর্মকর্তা কিছুদিন খাস কালেকশন পরিচালনাও করেন| এরই মধ্যে গত ২১ জুলাই মুক্তার আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টের ওই রিট পিটিশনটির সম্পূরক (সাপ্লিমেন্টারি) শুনানি করান| আদালত তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাদীর লিখিত বক্তব্য জমার নির্দেশ দিয়ে ১৫ আগস্ট চূড়ান্ত আদেশের দিন ধার্য করেন| অভিযোগ রয়েছে, মুক্তার আদালতের সেই আদেশ কপির বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে খাস কালেকশনের জন্য নিযুক্ত বিআইডব্লিউটিএ’র দুই কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ঘাট ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন|

ঘাট ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ঘাটে প্রতিদিন চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতো| ‘মুক্তার সিন্ডিকেটের’ লোকজন আমাকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে| বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় ফিরে এসেছি| এদিকে স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, হাইকোর্ট এ ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় না দিলেও মুক্তার নিজেকে ঘাটের প্রকৃত ইজারাদার দাবি করে দু’টি লঞ্চঘাট এলাকাকে পৃথক কয়েকটি গ্রুপে অন্তত ৬০ লাখ টাকায় সাব-ইজারা দিয়েছেন|

নাছিরগঞ্জ এলাকার সাব-ইজারাদার মো. রফিক জানান, বিআইডব্লিউটিএ’র সাথে মুক্তারের ভালো সম্পর্ক রয়েছে—এমন আশ্বাসে তিনি নাছিরগঞ্জ বাজার অংশটুকু এক বছরের জন্য নিয়েছেন| মতিরহাট অংশ নেওয়া ওমর ফারুক বলেন, মুক্তার আমাদের জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের পরামর্শেই সে রিট করেছে এবং সেই ইজারা পাবে| ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে আমি তাকে ইতোমধ্যে ৪ লাখ টাকা দিয়েছি|

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বিআইডব্লিউটিএ লক্ষ্মীপুর অফিসের কর্মকর্তা শাহ আলমের পরামর্শেই মুক্তার প্রথমে হাইকোর্টে রিট এবং পরবর্তীতে সম্পূরক শুনানি করিয়েছেন| কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা ছাড়া আদালতের শুনানির কাগজ দেখেই কর্মকর্তাদের ঘাট ছেড়ে চলে যাওয়া তাদের পারস্পরিক যোগসাজশেরই বহিঃপ্রকাশ| তবে, সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বিআইডব্লিউটিএ লক্ষ্মীপুর জেলা সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, মুক্তারের দেখানো কাগজে টোল আদায়ের কোনো বৈধ সুযোগ নেই| ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে|

এদিকে, সরেজমিন বিভিন্ন ঘাট এলাকায় ঘুরে টোল আদায়ের নামে ‘মুক্তার সিন্ডেকেটের’ প্রকাশ্য চাঁদাবাজির চিত্র দেখা যায়| মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের মালামালবাহী কার্গো জাহাজ থেকে ৩ হাজার টাকা, সিমেন্ট আনলোডে বস্তাপ্রতি ১২ টাকা, বালুবাহী বলগেট থেকে ১হাজার টাকাসহ প্রতিটি গরু থেকে ৬০, মহিষ প্রতি ১০০ টাকা ও কৃষিপণ্যসহ অন্তত ৯টি খাত থেকে অনৈতিকভাবে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে|
নবীগঞ্জ এলাকায় বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী আজগর হোসেন জানান, ভোলায় ১০০ টাকা রাজস্ব দিয়ে এক নৌকা হোগলা পাতা আনলেও এখানে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক ১৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে| একই এলাকার বালু ব্যবসায়ী মিলন ভান্ডারীর ম্যানেজার মো. সজীব অভিযোগ করে জানান, সাবেক সাব-ইজারাদার অনেকটা জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন| বর্তমান সাব-ইজারাদার টোলের জন্য অনবরত চাপ প্রয়োগ করছেন| ঘাটে একের পর এক এমন বেপরোয়া চাঁদা দাবি ও জিম্মিদশা অব্যাহত থাকলে নদীপাড় থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই|

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী নৌযান শ্রমিক কর্মচারী দলের প্রচার সম্পাদক মো. জুয়েল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র ঘাট ইজারাদাররা নিজেদের ইচ্ছামতো নৌযান শ্রমিকদের নানাভাবে হয়রানি করে| এমনকী একটা খালি বলগেট ঘাটে নোঙর করলেও জোর করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে| এই বেআইনি চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়া জরুরি|

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তার হোসেন বলেন, আমি জেলা পরিষদ থেকে খেয়া ঘাটের ইজারা নিয়েছি| বিআইডব্লিউটিএ এখানে সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে টোল আদায়ের চেষ্টা করছিল| তাই আমি আদালতের সরনাপন্ন হয়েছি| একই ঘাটেতো আর দুই কর্তৃপক্ষের ইজারা চলতে পারে না|
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ-জামান বলেন, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ঘাটে বেআইনি টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই| ভুক্তভোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুতই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে|
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, জেলা পরিষদের খেয়াঘাটের ইজারার দোহাই দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র নদী বন্দরে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ অবৈধ| মুক্তার হোসেন এমন প্রতারণা করে থাকলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে|

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত

কমলনগরে জেলা পরিষদের খেয়াঘাট ইজারাদারের নৈরাজ্য ‘মুক্তার সিন্ডিকেটের’ গলাকাটা টোল আদায়

আডেট সময় ১০:৩৯:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

শাহরিয়ার কামাল: লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আওতাধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাটে টোল আদায়ের নামে চরম নৈরাজ্য চলছে| মুক্তার হোসেন নামে জেলা পরিষদের এক খেয়াঘাট ইজারাদার সিন্ডিকেট তৈরি করে বেপরোয়া এ অনিয়ম করে যাচ্ছেন| অভিযোগ রয়েছে, মুক্তারের সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদী কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা বিভিন্ন ব্যবসার মালিকসহ স্থানীয় জনসাধারণ এখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন|

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার চরকালকিনি এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের ছেলে মুক্তার হোসেন লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের আওতাধীন ভোলা-লক্ষ্মীপুর (নৌ-রুট) খেয়াঘাট গত ১ জুলাই থেকে এক বছরের জন্য ইজারা নেন| ইজারার শর্ত অনুযায়ী খেয়া নৌকায় যাত্রী পারাপার ও মালামাল পরিবহন থেকে তিনি নির্ধারিত হারে টোল আদায় করবেন| কিন্তু ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে তিনি কয়েকগুণ লাভে স্থানীয় কাদির,আক্তার, মানিক ও শাহজাহান নামে চার ব্যক্তির কাছে খেয়া ঘাটটি সাব-ইজারা দিয়ে দেন| শুধু তাই নয়, জেলা পরিষদের খেয়াঘাট ইজারা নিয়ে তিনি দখলে নেন বিআইডব্লিউটিএ’র আওতাধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট দু’টি| মুক্তার হোসেন চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় মুদি ব্যবসা করার সুবাধে বিআইডব্লিউটিএ’র কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। ওই সুম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট দু’টির ইজারা প্রক্রিয়াও পণ্ড করে দেন| ফলে শুধুমাত্র খেয়া ঘাটের ইজারা নিয়ে কৌশলে ঘাটের পুরো নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি|

জানা গেছে, মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট ইজারা প্রদানের জন্য বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় দরপত্র আহ্বান করলে আগ্রহী ব্যক্তিরা তৎপরতা শুরু করেন| মুক্তার সেই প্রক্রিয়াকে পণ্ড করতে ঘাট দু’টি বিআইডব্লিউটিএ’র আওতাভুক্ত নয় দাবি করে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং-৪৪২২/২৬) দায়ের করেন| আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ৬ মাসের জন্য ইজারা প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দেন| যে কারণে, সরকারি রাজস্ব আদায় সমুন্নত রাখতে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ দু’জন শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তাকে খাস কালেকশনের দায়িত্ব দিয়ে ঘাটে পাঠায়| মো. তোফাজ্জল হোসেন ও মো. শামীম আল শাকিব নামের ওই দুই কর্মকর্তা কিছুদিন খাস কালেকশন পরিচালনাও করেন| এরই মধ্যে গত ২১ জুলাই মুক্তার আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টের ওই রিট পিটিশনটির সম্পূরক (সাপ্লিমেন্টারি) শুনানি করান| আদালত তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাদীর লিখিত বক্তব্য জমার নির্দেশ দিয়ে ১৫ আগস্ট চূড়ান্ত আদেশের দিন ধার্য করেন| অভিযোগ রয়েছে, মুক্তার আদালতের সেই আদেশ কপির বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে খাস কালেকশনের জন্য নিযুক্ত বিআইডব্লিউটিএ’র দুই কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ঘাট ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন|

ঘাট ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ঘাটে প্রতিদিন চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতো| ‘মুক্তার সিন্ডিকেটের’ লোকজন আমাকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে| বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় ফিরে এসেছি| এদিকে স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, হাইকোর্ট এ ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় না দিলেও মুক্তার নিজেকে ঘাটের প্রকৃত ইজারাদার দাবি করে দু’টি লঞ্চঘাট এলাকাকে পৃথক কয়েকটি গ্রুপে অন্তত ৬০ লাখ টাকায় সাব-ইজারা দিয়েছেন|

নাছিরগঞ্জ এলাকার সাব-ইজারাদার মো. রফিক জানান, বিআইডব্লিউটিএ’র সাথে মুক্তারের ভালো সম্পর্ক রয়েছে—এমন আশ্বাসে তিনি নাছিরগঞ্জ বাজার অংশটুকু এক বছরের জন্য নিয়েছেন| মতিরহাট অংশ নেওয়া ওমর ফারুক বলেন, মুক্তার আমাদের জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের পরামর্শেই সে রিট করেছে এবং সেই ইজারা পাবে| ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে আমি তাকে ইতোমধ্যে ৪ লাখ টাকা দিয়েছি|

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বিআইডব্লিউটিএ লক্ষ্মীপুর অফিসের কর্মকর্তা শাহ আলমের পরামর্শেই মুক্তার প্রথমে হাইকোর্টে রিট এবং পরবর্তীতে সম্পূরক শুনানি করিয়েছেন| কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা ছাড়া আদালতের শুনানির কাগজ দেখেই কর্মকর্তাদের ঘাট ছেড়ে চলে যাওয়া তাদের পারস্পরিক যোগসাজশেরই বহিঃপ্রকাশ| তবে, সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বিআইডব্লিউটিএ লক্ষ্মীপুর জেলা সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, মুক্তারের দেখানো কাগজে টোল আদায়ের কোনো বৈধ সুযোগ নেই| ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে|

এদিকে, সরেজমিন বিভিন্ন ঘাট এলাকায় ঘুরে টোল আদায়ের নামে ‘মুক্তার সিন্ডেকেটের’ প্রকাশ্য চাঁদাবাজির চিত্র দেখা যায়| মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের মালামালবাহী কার্গো জাহাজ থেকে ৩ হাজার টাকা, সিমেন্ট আনলোডে বস্তাপ্রতি ১২ টাকা, বালুবাহী বলগেট থেকে ১হাজার টাকাসহ প্রতিটি গরু থেকে ৬০, মহিষ প্রতি ১০০ টাকা ও কৃষিপণ্যসহ অন্তত ৯টি খাত থেকে অনৈতিকভাবে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে|
নবীগঞ্জ এলাকায় বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী আজগর হোসেন জানান, ভোলায় ১০০ টাকা রাজস্ব দিয়ে এক নৌকা হোগলা পাতা আনলেও এখানে তার কাছ থেকে জোরপূর্বক ১৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে| একই এলাকার বালু ব্যবসায়ী মিলন ভান্ডারীর ম্যানেজার মো. সজীব অভিযোগ করে জানান, সাবেক সাব-ইজারাদার অনেকটা জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন| বর্তমান সাব-ইজারাদার টোলের জন্য অনবরত চাপ প্রয়োগ করছেন| ঘাটে একের পর এক এমন বেপরোয়া চাঁদা দাবি ও জিম্মিদশা অব্যাহত থাকলে নদীপাড় থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই|

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী নৌযান শ্রমিক কর্মচারী দলের প্রচার সম্পাদক মো. জুয়েল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র ঘাট ইজারাদাররা নিজেদের ইচ্ছামতো নৌযান শ্রমিকদের নানাভাবে হয়রানি করে| এমনকী একটা খালি বলগেট ঘাটে নোঙর করলেও জোর করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে| এই বেআইনি চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়া জরুরি|

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তার হোসেন বলেন, আমি জেলা পরিষদ থেকে খেয়া ঘাটের ইজারা নিয়েছি| বিআইডব্লিউটিএ এখানে সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে টোল আদায়ের চেষ্টা করছিল| তাই আমি আদালতের সরনাপন্ন হয়েছি| একই ঘাটেতো আর দুই কর্তৃপক্ষের ইজারা চলতে পারে না|
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ-জামান বলেন, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ঘাটে বেআইনি টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই| ভুক্তভোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুতই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে|
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, জেলা পরিষদের খেয়াঘাটের ইজারার দোহাই দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র নদী বন্দরে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ অবৈধ| মুক্তার হোসেন এমন প্রতারণা করে থাকলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে|