এস এম আওলাদ হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট:
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা এবং পরবর্তীতে সন্দেহভাজন একজন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা—উভয়ই সভ্য রাষ্ট্র, আইনের শাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্য সমানভাবে উদ্বেগজনক। একটি অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় আরেকটি অপরাধ সংঘটিত হলে সমাজ কখনো ন্যায়বিচারের পথে এগোয় না; বরং প্রতিশোধ, বিশৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি অবিশ্বাসকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং ৩২ অনুচ্ছেদ আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতীত কারও জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দিয়েছে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যত বড় অপরাধেরই অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন হোন না কেন, তাঁকে হত্যা করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা জনতার নেই।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করলে তা ৩০২ ধারার অধীনে হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয় এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। গণপিটুনিতে যদি একজন মানুষের মৃত্যু ঘটে, তাহলে এতে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁদের ভূমিকা অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধে দায়ী হতে পারেন। “গণপিটুনি” নামে আইনে আলাদা কোনো বৈধতা নেই; এটি পরিস্থিতিভেদে হত্যা, হত্যাচেষ্টা বা গুরুতর আঘাতের মতো অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে, ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) এবং সাক্ষ্য আইন অনুসারে অপরাধ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযোগ গঠন এবং বিচার সম্পন্ন করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। বিচার করার ক্ষমতা জনগণের নয়। জনতার হাতে বিচার চলে গেলে নিরপরাধ মানুষও গুজব, ভুল পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন।
বাংলাদেশে অতীতেও গুজবের ভিত্তিতে অসংখ্য নিরপরাধ ব্যক্তি গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন, যা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্য গভীর কলঙ্ক।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে—অপরাধী বলে সন্দেহ হলেই তাকে জনতার হাতে তুলে দিয়ে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা। এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে আইন, আদালত এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। তখন অপরাধ দমন নয়, বরং “শক্তিই ন্যায়”—এই বিপজ্জনক মানসিকতা সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবে।
রায়পুরের চারটি হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃষ্টান্তমূলক হতে হবে। একইসঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ন্যায়বিচার কখনো বেছে বেছে প্রয়োগ করা যায় না। এক হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে আরেক হত্যাকে সমর্থন করলে আইনের শাসনের দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
যারা মানববন্ধন, প্রতিবাদ ও স্মারকলিপির মাধ্যমে চার হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছেন, তাঁদের উচিত একইসঙ্গে গণপিটুনির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়া। কারণ মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার ওপর নির্ভরশীল নয়; এগুলো সর্বজনীন নীতি।
রাষ্ট্রেরও উচিত শুধু ঘটনার পর মামলা নেওয়া নয়, গণপিটুনি প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বাস্তবায়ন করা।
মনে রাখতে হবে—বিচারহীনতা যেমন অপরাধকে উৎসাহিত করে, তেমনি জনতার হাতে বিচারও রাষ্ট্রকে অকার্যকর করে তোলে। সভ্য সমাজে অপরাধের বিচার হয় আদালতে, রাস্তায় নয়; আইনের শাসনই হতে হবে ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ।
মেঘনার তীর 



















