ঢাকা ০৮:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত লক্ষ্মীপুরে নকল ঘির ডিলারকে লাখ টাকা জরিমানা : ৩৫০ কেজি ঘি ধ্বংস লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিককে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় ৬জনকে আসামী করে থানায় মামলা, দুই মামলায় গ্রেফতার সন্ত্রাসী সাকিব  দীপ্ত টিভির সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা, বাহিনী প্রধান সাকিবকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে একই পরিবারের তিনজন নিহত রায়পুরে মাদকাসক্ত যুবকের দেয়া আগুনে পুড়ে গেছে ১১টি বসতঘরসহ৬ দোকান,অভিযুক্তকে গনপিটুনি উৎসাহ-উদ্দীপনায় শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী উদযাপিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ :স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জাতীয়তাবাদের নতুন রাজনীতি সৃষ্টি করেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: পানিসম্পদমন্ত্রী

ফিরে দেখা: লক্ষ্মীপুরে ৪ আগষ্টে কি ঘটেছিল! ৬২৫জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ১২:৫২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • 255

স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই গনঅভ্যুাত্থানে লক্ষ্মীপুরে চার শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় তিনটি মামলায় আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও সহযোগি সংগঠনের ৬২৫জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জসীট দেয় পুলিশ।

পুলিশ,শিক্ষার্থী, নিহতের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, জুলাইয়ে সারাদেশে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের দাবীতে যখন দেশ উত্তাল। তখন লক্ষ্মীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনও তুঙ্গে উঠেছে। প্রতিদিনই শহরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক কর্মসুচি পালন করছে ছাত্র-জনতা।

সূত্রপাত ৩ আগষ্ট শুক্রবার জুমার নামাজের পর শহরের চকবাজার মসজিদের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এখবর পেয়ে ওইদিন জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও অপসারনকৃত উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম সালাউদ্দিন টিপুর নেতৃত্বে পাল্টা যুবলীগের কর্মসুচি ঘোষনা করেন টিপু। নামাজ শেষ হতে না হতেই টিপুর নেতৃত্বে যুবলীগের নেতাকর্মীরা মসজিদের ভিতর ও বাইরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। কিন্তু পিছু হটেনি আন্দোলনকারীরা। কিছুক্ষন পর শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে চকবাজার মসজিদের সামনে থেকে বিশাল মিছিল নিয়ে বের হয়। এরপর টিপুর বাসার সামনে দিয়ে মিছিলটি যাওয়ার সময় অর্তকিতভঅবে দ্বিতীয়বার হামলা করে যুবলীগের কর্মীরা। এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র-জনতা আহত হয়।

তবে ওইদিন লক্ষ্মীপুরের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবি সিদ্দিক,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসান মোস্তফা স্বপন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর-সার্কেল) সোহেল রানার নেতৃত্বে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকার কারনে বড়ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ওইদিনের হামলার পর থেকে সাধারন মানুষ একেএম সালাউদ্দিন টিপুর প্রতি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

লক্ষ্মীপুরে ৪ আগষ্ট যা ঘটেছে

৪ আগষ্ট রোববার। পূর্বে আকাশে সূর্য উঠার সাথে সাথে আন্দোলনকারী শহরের অলিতে-গলিতে অবস্থান নেয়। সকাল সাড়ে ৭টা। বাগবাড়ি কৃষি অফিসের সামনে আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে চেষ্টা করে। এসময় কলেজ ছাত্রলীগ নেতা সেবাক মাহমুদ,জুয়েল, যুবলীগের ইমন,রায়হানসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ২০ থেকে ৩০জন সশস্্র অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ধরে ব্যাপক মারধর করে আহত করে। অন্দোলনকারীরা পিছু না হটে মোকাবেলার চেষ্টা করে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা বাগবাড়িতে একত্রিত হয়ে মিছিল বের করে। পরে মিছিলটি ঝুমুর এলাকায় অবস্থান নেয়।

একই সময় উত্তর তেমুহনীতে জড়ো হতে থাকে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ,ছাত্রলীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কবির পাটওয়ারী,সাইফুল হাসান পলাশ, পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি সৈয়দ আহমদ পাটওয়ারী ও এডভোকেট জহির উদ্দিন বাবর, জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপু, যুবলীগ নেতা বায়োজিদ ভূইয়া, শাখায়াত হোসেন আরিফ, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম রকি ও সাধারন সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ভূইয়া, নজরুল ইসলাম ভূলু,সাবেক পিপি জসিম উদ্দিন,রাসেল মাহুমদ মান্না, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বাবর ও রাকিব হোসেন লোটাস,শাহজাহান মেম্বার,দিঘলীর জাবেদ হোসেন,তাজু, সোহেল, চন্দ্রগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ,আবু তালেব, বাংগাখাঁর মিজানুর রহমান ভূইয়ার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা উত্তর তেমুহানীতে জড়ো হয়। এছাড়া সাবেক পৌর মেয়র মোজাম্মেল হায়দার মাসুম ভূইয়ার নেতৃত্বে হ্যাপী সড়ক থেকে একটি মিছিল নিয়ে বের হয়।

সকাল সাড়ে ১০টা। হঠাৎ লাটিসোটা ও প্রকাশ্যেই অস্ত্র নিয়ে উত্তর তেমুহনী থেকে মিছিল নিয়ে ঝুমুরে দিকে অগ্রসর হয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি বাগবাড়িতে পৌঁছালে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করে আহত করা হয় কয়েকজনকে। এসময় বেশ কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় চরম আতংক ও ত্রাস সৃষ্টি করে মিছিলকারীরা। হামলার খবর পেয়ে ঝুমুর এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বাগবাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। মিছিলটি মাদামব্রীজের পূর্বপ্রান্তে পৌঁছলে টিপু,বায়োজিদ ভূইয়া ও হেলমেট পরা কয়েকজন সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। এসময় সাংবাদিক আব্বাছ হোসেন,ইউসুফ,আনিস,শিবলু, তারেক, বিএম সাগরসহ কয়েকজন সাংবাদিক জীবন ঝুঁকি নিয়ে গুলির মুখোমুখি হয়ে দায়িত্ব পালন করে। এক পর্যায়ে সার্কিট হাউজ গেইটের সামনে অবস্থান নেয় সাংবাদিকরা। সার্কিট হাউজের গেইট তালাবদ্ধ থাকায় এক বিভীষিকাময় পার করে তারা। এসময় ব্রিজের ওপর প্রথম গুলিবিদ্ধ হয়ে কলেজ শিক্ষার্থী সাদ আল আফনান ঘটনাস্থলে মারা যায়। আহত হয় অর্ধশতাধিক।

 

এরপর পাল্টে যায় পুরো দৃষ্যপট:

আফনান নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজারো ছাত্র-জনতা জড়ো আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। এইভাবে চলতে থাকে একের পর এক ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। আর পিছু হঠতে থাকে আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীরা। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে রাস্তা ছেড়ে টিপু ও তার লোকজন তমিজ মার্কেট,তার বাসায় ও চাদে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীরা উত্তর তেমুহানী ও দক্ষিন দিক থেকে দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে টিপুর বাসার দিকে অগ্রসর হয়।

এসময় টিপু ও তার লোকজন বাসার ছাঁদ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ঁতে থাকে শিক্ষার্থীদের ওপর। টিপুর আরেকটি গ্রুপ নিচে শাখাঁরী পাড়া মোড় ও তিতাখা মসজিদ এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর কয়েকদফা হামলা করে। এইখানে দীর্ঘক্ষন চলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ককেটল বিস্ফোরন। এসময় গুলিতে আরো তিন আন্দোলনকারী নিহত হয়। তারা হচ্ছে, সাবির হোসেন, কাউছার হোসেন বিজয় ও ওসমান গনি। এনিয়ে ওইদিন মারা যায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চার শিক্ষার্থী। আড়াইশ গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় তিনশর বেশি মানুষ। এতে টিপুর বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা। আর বিক্ষুব্দ জনতার হাতে গনটিপুনিতে ছাত্রলী-যুবলীগ ও আওয়ামীলীগের ৮কর্মী নিহত হয়। এসময় টিপুর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এরপর আরেক দফায় বাড়িটি বোল্ডোজার দিয়ে সামনের অংশ ভেঙ্গে ফেলা হয়। এতে করে পুরো বাড়িটি ঝুকিঁপূর্ণ হয়ে উঠে। আর এই বাড়ি থেকে জেলা আওয়ামীলীগের সকল রাজনীতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এখন কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। পাশাপাশি বাড়ির সামনে ময়লার বাগাড়ে পরিনত হয়েছে। এর আগে অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকা পড়ে টিপুর বাসার ভিতরে ২৮জন। পরে ওই দিন গভীর রাতে তাদের উদ্ধার করে নিরাপদে পৌঁছে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।

চার শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় তিনটি মামলা:
সাদ আল আফনান হত্যার ঘটনায় নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে,টিপু ও মাসুম ভূইয়াসহ ৭৫জনের নাম উল্লেখ আরো ৬০০জনকে অজ্ঞাত আসামী করে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে সাব্বির হোসেন হত্যার ঘটনায় পৃথক আরো একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ৯১জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ২০০জনকে আসামী করা হয়। গুলিবিদ্ধ আহত আবদুল মতিন আরো একটি মামলা করেন। ওই মামলায় জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি গোলাম ফারুক পিংকুসহ ৭৬জনের নাম উল্লেখ করে আরো দেড়শজনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়। এসব মামলায় জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ইউনিটের আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ,স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ প্রায় তিনশতাধিক জনকে গ্রেফতার করা হয়। ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ৩টি মামলায় ২৮৬জন এজহার নামীয় এবং ৩৬৭জনসহ ৬২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট প্রেরণ করা হয়েছে।

শহীদ সাদ আল আফনানের মা নাসিমা আক্তার বলেন, ছেলে হারানোর দুই মাস আগে স্বামীকে হারিয়েছি। জুলাই গনঅভ্যুত্থানেও ছেলেকে হারিয়েছি। দুই বছর হলো মামলা করে বিভিন্ন হুমকি ধমকিসহ ভয়ে এখনো অন্যত্রে বসবাস করি। আমরা আশাবাদি ছিলাম নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় গেলে ছেলে হত্যার বিচার পাবো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই আশা অরণ্যরোদন মাত্র। সন্ত্রাসীরা যেভাবে আফনানকে হত্যা করেছে, পশুপাখিকেও মানুষ এমন ভাবে হত্যা করে না। এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জীবদ্দশায় ছেলে হত্যার বিচার দেখে যাওয়ার আকুতি জানান।

 

ঘটনার দুই বছর হতে চলছে, এখনো ছেলের শরীরের ক্ষত-বিক্ষত গুলির ছিন্নভিন্ন ছবি বুকে নিয়ে কান্নাকাটি করছেন নিহত সাব্বিরের মা মায়া বেগম ও বাবা আমির হোসেন। কোনভাবেই এই হত্যাকান্ডটি মেনে নিতে পারছেনা তারা। তবে যে আশায় সাব্বিরের মতো ছাত্ররা বুকের তাঁজারক্ত দিয়ে দ্বিতীয়বার দেশ স্বাধীন করেছেন। তা যেন মুছে না যায়। সুন্দর একটি বাংলাদেশ চেয়েছি। পাশাপাশি খুনি সালাহ উদ্দিন টিপুসহ জড়িতদের বিচার ও গ্রেফতার নিশ্চিত করার দাবী জানান তারা।

এদিকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফ্যাসিষ্টের দোসরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন একক কোন দলের নয়, এটি ছাত্র-জনতাসহ সবার বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির য্গ্মু আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট হাছিবুর রহমান ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী সম্পাদক মহসিন কবির মুরাদ। এসময় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবী জানান জামায়াতের এ নেতা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদের ঘটনায় দুটি হত্যাসহ মোট তিনটি মামলা হয়। এতে ৩২৮জন এজহার নামীয় আসামী ছাড়াও ১১শ ৫০জন অজ্ঞাত নামা আসামী করা হয়। ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ৩টি মামলায় ২৮৬জন এজহার নামীয় এবং ৩৬৭জনসহ মোট ৬২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট প্রেরণ করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের নামই তথ্য-উপাত্তর মাধ্যমে পুলিশের এ প্রতিবেদনে এসেছে। বাকী বিচারীক কার্যক্রম আদালতের। প্রধান আসামীদের গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি জানান, প্রধান আসামীর দেশে উপস্থিতির তথ্য না থাকায় তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধান আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে বলে জানা পুলিশের এই কর্মকর্তা।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত

ফিরে দেখা: লক্ষ্মীপুরে ৪ আগষ্টে কি ঘটেছিল! ৬২৫জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন

আডেট সময় ১২:৫২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই গনঅভ্যুাত্থানে লক্ষ্মীপুরে চার শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় তিনটি মামলায় আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও সহযোগি সংগঠনের ৬২৫জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জসীট দেয় পুলিশ।

পুলিশ,শিক্ষার্থী, নিহতের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, জুলাইয়ে সারাদেশে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের দাবীতে যখন দেশ উত্তাল। তখন লক্ষ্মীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনও তুঙ্গে উঠেছে। প্রতিদিনই শহরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক কর্মসুচি পালন করছে ছাত্র-জনতা।

সূত্রপাত ৩ আগষ্ট শুক্রবার জুমার নামাজের পর শহরের চকবাজার মসজিদের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এখবর পেয়ে ওইদিন জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও অপসারনকৃত উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম সালাউদ্দিন টিপুর নেতৃত্বে পাল্টা যুবলীগের কর্মসুচি ঘোষনা করেন টিপু। নামাজ শেষ হতে না হতেই টিপুর নেতৃত্বে যুবলীগের নেতাকর্মীরা মসজিদের ভিতর ও বাইরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। কিন্তু পিছু হটেনি আন্দোলনকারীরা। কিছুক্ষন পর শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে চকবাজার মসজিদের সামনে থেকে বিশাল মিছিল নিয়ে বের হয়। এরপর টিপুর বাসার সামনে দিয়ে মিছিলটি যাওয়ার সময় অর্তকিতভঅবে দ্বিতীয়বার হামলা করে যুবলীগের কর্মীরা। এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র-জনতা আহত হয়।

তবে ওইদিন লক্ষ্মীপুরের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবি সিদ্দিক,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসান মোস্তফা স্বপন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর-সার্কেল) সোহেল রানার নেতৃত্বে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকার কারনে বড়ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ওইদিনের হামলার পর থেকে সাধারন মানুষ একেএম সালাউদ্দিন টিপুর প্রতি ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

লক্ষ্মীপুরে ৪ আগষ্ট যা ঘটেছে

৪ আগষ্ট রোববার। পূর্বে আকাশে সূর্য উঠার সাথে সাথে আন্দোলনকারী শহরের অলিতে-গলিতে অবস্থান নেয়। সকাল সাড়ে ৭টা। বাগবাড়ি কৃষি অফিসের সামনে আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে চেষ্টা করে। এসময় কলেজ ছাত্রলীগ নেতা সেবাক মাহমুদ,জুয়েল, যুবলীগের ইমন,রায়হানসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ২০ থেকে ৩০জন সশস্্র অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ধরে ব্যাপক মারধর করে আহত করে। অন্দোলনকারীরা পিছু না হটে মোকাবেলার চেষ্টা করে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা বাগবাড়িতে একত্রিত হয়ে মিছিল বের করে। পরে মিছিলটি ঝুমুর এলাকায় অবস্থান নেয়।

একই সময় উত্তর তেমুহনীতে জড়ো হতে থাকে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ,ছাত্রলীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কবির পাটওয়ারী,সাইফুল হাসান পলাশ, পৌর আওয়ামীলীগের সভাপতি সৈয়দ আহমদ পাটওয়ারী ও এডভোকেট জহির উদ্দিন বাবর, জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপু, যুবলীগ নেতা বায়োজিদ ভূইয়া, শাখায়াত হোসেন আরিফ, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম রকি ও সাধারন সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ভূইয়া, নজরুল ইসলাম ভূলু,সাবেক পিপি জসিম উদ্দিন,রাসেল মাহুমদ মান্না, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বাবর ও রাকিব হোসেন লোটাস,শাহজাহান মেম্বার,দিঘলীর জাবেদ হোসেন,তাজু, সোহেল, চন্দ্রগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ,আবু তালেব, বাংগাখাঁর মিজানুর রহমান ভূইয়ার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা উত্তর তেমুহানীতে জড়ো হয়। এছাড়া সাবেক পৌর মেয়র মোজাম্মেল হায়দার মাসুম ভূইয়ার নেতৃত্বে হ্যাপী সড়ক থেকে একটি মিছিল নিয়ে বের হয়।

সকাল সাড়ে ১০টা। হঠাৎ লাটিসোটা ও প্রকাশ্যেই অস্ত্র নিয়ে উত্তর তেমুহনী থেকে মিছিল নিয়ে ঝুমুরে দিকে অগ্রসর হয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি বাগবাড়িতে পৌঁছালে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করে আহত করা হয় কয়েকজনকে। এসময় বেশ কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় চরম আতংক ও ত্রাস সৃষ্টি করে মিছিলকারীরা। হামলার খবর পেয়ে ঝুমুর এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বাগবাড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। মিছিলটি মাদামব্রীজের পূর্বপ্রান্তে পৌঁছলে টিপু,বায়োজিদ ভূইয়া ও হেলমেট পরা কয়েকজন সন্ত্রাসী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। এসময় সাংবাদিক আব্বাছ হোসেন,ইউসুফ,আনিস,শিবলু, তারেক, বিএম সাগরসহ কয়েকজন সাংবাদিক জীবন ঝুঁকি নিয়ে গুলির মুখোমুখি হয়ে দায়িত্ব পালন করে। এক পর্যায়ে সার্কিট হাউজ গেইটের সামনে অবস্থান নেয় সাংবাদিকরা। সার্কিট হাউজের গেইট তালাবদ্ধ থাকায় এক বিভীষিকাময় পার করে তারা। এসময় ব্রিজের ওপর প্রথম গুলিবিদ্ধ হয়ে কলেজ শিক্ষার্থী সাদ আল আফনান ঘটনাস্থলে মারা যায়। আহত হয় অর্ধশতাধিক।

 

এরপর পাল্টে যায় পুরো দৃষ্যপট:

আফনান নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজারো ছাত্র-জনতা জড়ো আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। এইভাবে চলতে থাকে একের পর এক ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। আর পিছু হঠতে থাকে আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসীরা। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে রাস্তা ছেড়ে টিপু ও তার লোকজন তমিজ মার্কেট,তার বাসায় ও চাদে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীরা উত্তর তেমুহানী ও দক্ষিন দিক থেকে দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে টিপুর বাসার দিকে অগ্রসর হয়।

এসময় টিপু ও তার লোকজন বাসার ছাঁদ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ঁতে থাকে শিক্ষার্থীদের ওপর। টিপুর আরেকটি গ্রুপ নিচে শাখাঁরী পাড়া মোড় ও তিতাখা মসজিদ এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর কয়েকদফা হামলা করে। এইখানে দীর্ঘক্ষন চলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও ককেটল বিস্ফোরন। এসময় গুলিতে আরো তিন আন্দোলনকারী নিহত হয়। তারা হচ্ছে, সাবির হোসেন, কাউছার হোসেন বিজয় ও ওসমান গনি। এনিয়ে ওইদিন মারা যায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চার শিক্ষার্থী। আড়াইশ গুলিবিদ্ধসহ আহত হয় তিনশর বেশি মানুষ। এতে টিপুর বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা। আর বিক্ষুব্দ জনতার হাতে গনটিপুনিতে ছাত্রলী-যুবলীগ ও আওয়ামীলীগের ৮কর্মী নিহত হয়। এসময় টিপুর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এরপর আরেক দফায় বাড়িটি বোল্ডোজার দিয়ে সামনের অংশ ভেঙ্গে ফেলা হয়। এতে করে পুরো বাড়িটি ঝুকিঁপূর্ণ হয়ে উঠে। আর এই বাড়ি থেকে জেলা আওয়ামীলীগের সকল রাজনীতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এখন কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। পাশাপাশি বাড়ির সামনে ময়লার বাগাড়ে পরিনত হয়েছে। এর আগে অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকা পড়ে টিপুর বাসার ভিতরে ২৮জন। পরে ওই দিন গভীর রাতে তাদের উদ্ধার করে নিরাপদে পৌঁছে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।

চার শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় তিনটি মামলা:
সাদ আল আফনান হত্যার ঘটনায় নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে,টিপু ও মাসুম ভূইয়াসহ ৭৫জনের নাম উল্লেখ আরো ৬০০জনকে অজ্ঞাত আসামী করে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে সাব্বির হোসেন হত্যার ঘটনায় পৃথক আরো একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ৯১জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ২০০জনকে আসামী করা হয়। গুলিবিদ্ধ আহত আবদুল মতিন আরো একটি মামলা করেন। ওই মামলায় জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি গোলাম ফারুক পিংকুসহ ৭৬জনের নাম উল্লেখ করে আরো দেড়শজনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়। এসব মামলায় জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ইউনিটের আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ,স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ প্রায় তিনশতাধিক জনকে গ্রেফতার করা হয়। ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ৩টি মামলায় ২৮৬জন এজহার নামীয় এবং ৩৬৭জনসহ ৬২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট প্রেরণ করা হয়েছে।

শহীদ সাদ আল আফনানের মা নাসিমা আক্তার বলেন, ছেলে হারানোর দুই মাস আগে স্বামীকে হারিয়েছি। জুলাই গনঅভ্যুত্থানেও ছেলেকে হারিয়েছি। দুই বছর হলো মামলা করে বিভিন্ন হুমকি ধমকিসহ ভয়ে এখনো অন্যত্রে বসবাস করি। আমরা আশাবাদি ছিলাম নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় গেলে ছেলে হত্যার বিচার পাবো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই আশা অরণ্যরোদন মাত্র। সন্ত্রাসীরা যেভাবে আফনানকে হত্যা করেছে, পশুপাখিকেও মানুষ এমন ভাবে হত্যা করে না। এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জীবদ্দশায় ছেলে হত্যার বিচার দেখে যাওয়ার আকুতি জানান।

 

ঘটনার দুই বছর হতে চলছে, এখনো ছেলের শরীরের ক্ষত-বিক্ষত গুলির ছিন্নভিন্ন ছবি বুকে নিয়ে কান্নাকাটি করছেন নিহত সাব্বিরের মা মায়া বেগম ও বাবা আমির হোসেন। কোনভাবেই এই হত্যাকান্ডটি মেনে নিতে পারছেনা তারা। তবে যে আশায় সাব্বিরের মতো ছাত্ররা বুকের তাঁজারক্ত দিয়ে দ্বিতীয়বার দেশ স্বাধীন করেছেন। তা যেন মুছে না যায়। সুন্দর একটি বাংলাদেশ চেয়েছি। পাশাপাশি খুনি সালাহ উদ্দিন টিপুসহ জড়িতদের বিচার ও গ্রেফতার নিশ্চিত করার দাবী জানান তারা।

এদিকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফ্যাসিষ্টের দোসরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন একক কোন দলের নয়, এটি ছাত্র-জনতাসহ সবার বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির য্গ্মু আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট হাছিবুর রহমান ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী সম্পাদক মহসিন কবির মুরাদ। এসময় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবী জানান জামায়াতের এ নেতা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদের ঘটনায় দুটি হত্যাসহ মোট তিনটি মামলা হয়। এতে ৩২৮জন এজহার নামীয় আসামী ছাড়াও ১১শ ৫০জন অজ্ঞাত নামা আসামী করা হয়। ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ৩টি মামলায় ২৮৬জন এজহার নামীয় এবং ৩৬৭জনসহ মোট ৬২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট প্রেরণ করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের নামই তথ্য-উপাত্তর মাধ্যমে পুলিশের এ প্রতিবেদনে এসেছে। বাকী বিচারীক কার্যক্রম আদালতের। প্রধান আসামীদের গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি জানান, প্রধান আসামীর দেশে উপস্থিতির তথ্য না থাকায় তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধান আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে বলে জানা পুলিশের এই কর্মকর্তা।