তাবারক হোসেন আজাদ: আকবর হোসেন সম্রাট, বয়স (৪০)। পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী। এর পাশাপাশি সমাজসেবা কাজ নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর শহরের নতুনবাজার ভাড়া বাসায় এপ্রিল মাসে তার বিদ্যুত বিল আসে ৪,৩৩৯ টাকা। মে মাসে বিল এসেছে ৯,৭৩৩ টাকা। অপরদিকে- মাসুদ আলম নামে এক দিনমজুরের ক্ষেতের সেচ মিটার গত দুই মাস (এপ্রিল ও মে) ধরে বন্ধ। অথচ তাকে মাসের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে ৬,৪২১ টাকা।। গত এক বছর ধরে এমন অত্যাচার সহ্য করে চলেছেন তিনি। বিদ্যুৎ অফিসে গেলে সমন্বয় করার কথা বললেও তা আর করেন না।
বেসরকারি হাসপাতালের চাকরিজীবী ও শহরের টিএনটি সড়কের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন। তিনি ৩৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন। অথচ গত এপ্রিল মাসে ১,৬৯০বিল করা হলেও এবার তার মিটারে বিল হয়েছে ৩,১৯২ টাকা। অর্থাৎ সেখানেও ব্যবহারের পরিমাণ ৭২ ইউনিট করেই। এরপরও এতটা হেরফের কেনো- এমন প্রশ্ন সম্রাট ও জসিমের।
জসিম নামের ওই বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘ছোট একটি চাকরির পাশাপাশি একজন সংবাদকর্মীও তিনি। নানা কারণে সব সময় সংকট। এই পরিস্থিতিতে আমি নিজে কীভাবে আছি সেটাতো আমি নিজে ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি তো সাহায্য চাচ্ছি না। কিন্তু সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে যে সুবিবেচনা দরকার, তাও করা হচ্ছে না।’ বিদ্যুৎ বিভাগের এই অবস্থা শুধু লক্ষ্মীপুরের রায়পুর-ই নয়, সদর ও রামগঞ্জ উপজেলাতেও ঘটেছে। গ্রাহকদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ।
শুধু সম্রাট ও জসিম উদ্দিনই নন, গত এক বা দুই মাসের বাড়তি বিলের এই ধকল পোহাতে হচ্ছে শিক্ষক, সাংবাদিক, পুলিশসহ অনেককে। যারা বিত্তবান, তাদের সংকট না হলেও বিপাকে পড়েছেন জসিমের মতো আর্থিক টানাপড়েনে থাকা মানুষরা। জসিম উদ্দিনের মতো তাদের কাছেও যে প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়, মানুষের কি টাকা বেশি হয়, ৩-৪ মাস পরপর অতিরিক্ত বিল ধরিয়ে দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি।
একদিকে তীব্র লোডশেডিং ও দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি অন্যদিকে ভূতুরে এবং অতিরিক্ত বিল। অনেকে চাকরি থেকে ঠিকঠাক বেতনও পাচ্ছেন না বা ব্যাবসাও খারাফ যাচ্ছে। কিন্তু এরমধ্যেই এই ‘অসঙ্গত’ তৎপরতা শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি। অতিরিক্ত বিল আদায় করা হচ্ছে। সেটি এক মাসের নয়, দুই-তিন মাস পর চলছে এমন নৈরাজ্য আর গাফিলতি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ইউএনও’র কাছে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে বিল ঠিক করে নিতে বলেছেন।
এ ধরনের অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে জেলা বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ দিলেও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই অতিরিক্ত বিল করেছেন, তাদের বিষয়ে কোনোা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় তারাও বাড়তি বিল আদায় করেই চলেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভুল করবেন যিনি, ঠিক করবেন তিনি। কিন্তু এক্ষেত্রে ভুল যদি বিদ্যুৎ অফিস করে তাহলে এই বিল ঠিক করতে কেন গ্রাহককে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে। আর এসব অন্যায় যাদের দেখার কথা সেই এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। এর মধ্যে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এসব অভিযোগ করলেও তারা যেন কিছুতেই পাত্তা দিচ্ছেন না।
বিদ্যুৎ বিলের ভোগান্তি তুলে ধরে উদমারা গ্রামের বাসিন্দা ও শহরের মুদি ব্যাবসায়ী মো. রাজু অভিযোগ করেন, তিনি বিকাশে বিল দিয়ে থাকেন। মে মাসে ডাবল বিল আসছে। ‘লুটেপুটে খাওয়ার আরেক উৎসের নাম বিদ্যুৎ বিল। একই কথা বলেন, রায়পুর এলএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ও থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা।
প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান ও ব্যাবসায়ী আকবর হোসেন সম্রাট জানান, তারা বাসায় ছোট পরিবার নিয়ে থাকেন। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহারও কম হয়। গিজারও নেই, প্রেসার কুকারও নেই। গত দুই মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিল এসেছে এই মে মাসে।
একই অভিযোগ করে নিউ মার্কেটের জুমা ফ্যাশনের মালিক নজির আহাম্মদ বলেন, এপ্রিল মাসে বিল আসে ৯০০ টাকা আর মে মাসে আসছে ৩২৫০ টাকা। এ নিয়ে স্থানীয় অফিসে কথা বলেছি। তারা এখন বিল দিয়ে দিতে বলেছেন, পরে অ্যাডজাস্ট করবে। কিন্তু এভাবে যদি সবার কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা বিল আদায় করা হয়, এতে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে। সবাই কি আসলেই এই অতিরিক্ত বিল দিতে পারবে, এসব বিষয় বিবেচনা করা দরকার। দ্রুত সমাধান করা উচিত। এইভাবে গ্রাহকদের হয়রানি করার কোনো মানে নাই।’
একই ধরনের অভিযোগ করছেন শহরের মীরগঞ্জ সড়কে বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন হাওলাদার। তিনি জানান, এপ্রিলে তার বিল আসে ৬৭০ টাকা আর অক্টোবরে আসছে ১২৪০ টাকা। মিয়া রুবেল রহমান বলেন, তাকে ও বিল দেওয়া হয় ১০৬০ টাকা। তারা বলেন, ‘প্রত্যেকের একটা বাজেট আছে। দ্বিগুণ বিদ্যুৎ বিল বললেই তো দিয়ে দেওয়া যায় না। আবার ঘোষণা দিয়েছে ষথাসময়ে সব বিল পরিশোধ করতে হবে। এত বাড়তি বিল আমরা কেনো দেব। এই স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হওয়া দরকার।’
এদিকে আবার অনেকে অভিযোগ করেছেন, বিকাশে বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার পরও পরের মাসে বকেয়া বিলসহ যুক্ত করে বিল এসেছে। এখন এইসব সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে সেটাই প্রশ্ন। গ্রাহকদের এমন অভিযোগের পর বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছেন না তারা।
এ বিষয়ে রায়পুর পল্লী বিদ্যুতের ডিপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোশারফ হোসেন বলেন, ‘মিটার রিডিং না দেখেই মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কিছু ভুল তো হবেই। কারও যদি কোনো বিলের অভিযোগ থাকে অফিসে জানাতে পারেন। ভুল থাকলে ঠিক করে দেওয়া হবে। কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই তার সমাধান করার চেষ্টা করছি।’ তাছাড়া সরকার ১ টাকা ৩০ পয়সা করে বাড়িয়েছে, কোরবানের ঈদ, অতিরিক্ত গরমে ও লোডশেডিংয়ে ফ্রীজ-ফ্যান ব্যাবহার করায় বিল বেশি হয়।
উল্লেখ্য, রায়পুর, পানপাড়া, রাখালিয়া ও হায়দরগঞ্জ জোনাল অফিসের মাধ্যমে ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভাসহ এক লক্ষ ৪ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। এক হাজার ৩১৮ কিলোমিটারে আবাসিক ৭৯ হাজার ৯২২ এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক সাত হাজার ৬৩৯ জন। রায়পুর সোনাপুর ইউপির রাখালিয়া, চরআবাবিল ইউপির হায়দরগঞ্জ ও চরবংশি ইউপির আখনবাজারে স্থাপিত চারটি অভিযোগ কেন্দ্রের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা চলছে। গত দুই বছর থেকে কয়েকটি নিয়মের কারণে গ্রাহকদের মাঝে মিটার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
মেঘনার তীর 



















