তাবারক হোসেন আজাদ: লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে কবিরাজি চিকিৎসার আড়ালে চলছে এক ভয়াবহ ও অভিনব প্রতারণার ফাঁদ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই হাড় ভাঙা চিকিৎসার নামে অসহায় মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এই হাতুড়ে কারবারের জাঁতাকলে পড়ে রোগীরা উপশমের বদলে ধাবিত হচ্ছেন স্থায়ী পঙ্গুত্বের দিকে। সম্প্রতি কয়েকজন ভুক্তভোগী নারীর টাকা আত্মসাৎ ও তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে। কয়েকদিনের সরেজমিনে অনুসন্ধানে মিলেছে গোপন আস্তানা এবং নেপ থ্যে থাকা কথিত কয়েক প্রভাবশালির দাপট। মঙ্গলবার (২৩ জুন) ভন্ড কবিরাজ বাহারের বিচার ও টাকা ফেরতের দাবিতে চরআবাবিল গ্রামের মৃত শহীদ উল্লাহ বকাউলের ক্ষতিগ্রস্থ মেয়ে ফাহিমা বেগম রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিনে রায়পুর পৌর ১নং ওয়ার্ডের পূর্বলাছ এলাকার কথিত কবিরাজ বাহারের (৩৫) বাড়িতে অনুসন্ধানে যান এই প্রতিবেদকসহ কয়েকজন সাংবাদিক। বাহারের বাড়ির ভেতরের একটি নির্জন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে এই চিকিৎসার গোপন আস্তানা। দূর থেকে সাধারণ টিনশেড ঘর মনে হলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে রীতিমতো আধুনিক হাসপাতালের আদলে বিছানা (বেড) পেতে রাখা হয়েছে। চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সাধারণ মানুষের হাত-পা ভেঙে যাওয়া রোগীদের প্লাস্টার কাটার পর ফেলে দেওয়া আবর্জনার বিশাল স্তূপ। মেডিকেল সায়েন্সের তোয়াক্কা না করে কীভাবে এই প্লাস্টার ও হাড় জোড়ার কারবার চলছে—জানতে চাইলে কথিত কবিরাজ বাহার সদর্পে ক্যামেরার সামনে দাবি করেন, এটি নাকি তাঁর ‘বাবার স্বপ্নে পাওয়া’ চিকিৎসা! এই অলৌকিক ও অবৈজ্ঞানিক বিদ্যার জেরেই প্রতিদিন ডজন ডজন মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন তিনি।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই পুরো প্রতারণা সাম্রাজ্যের মূল থিংক-ট্যাংক ও রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছেন স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী। তাদের ছত্র –ছায়াতেই দীর্ঘদিন ধরে বাহার স্থানীয় বিভিন্ন মহল ‘ম্যানেজ’ করার দাপট দেখিয়ে এই অবৈধ কারবার নির্বিঘ্নে চালিয়ে আসছিলেন। কবিরাজ বাহারের অপচিকিৎসার শিকার হয়েছেন উপজেলার উত্তর চরআবাবিল ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফাহিমা বেগম। তিনি তাঁর বৃদ্ধ বাবা ও খালার পা ভাঙার চিকিৎসার জন্য সরল বিশ্বাসে বাহারের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বাহার রোগ মুক্তির শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে অসহায় রুচিয়া বেগমের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। চুক্তি ছিল, রোগ ভালো না হলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু বাহারের দেওয়া অজ্ঞাত রাসায়নিক মিশ্রিত ওষুধ ও মালিশের পর উল্টো রোগীদের পায়ের ব্যথার তীব্রতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় এবং অঙ্গহানির আশঙ্কাজনক রূপ নেয়।
পরবর্তীতে ফাহিমা বেগম চুক্তি অনুযায়ী টাকা ফেরত চাইলে কবিরাজ বাহার ও তার অনুসারী রা রুচিয়া বেগমের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ সহ প্রাণনাশের হুমকি দেয়। অসহায় ভুক্তভোগী নারী নিরুপায় হয়ে রায়পুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম বলেন, “বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। ফাহিমা নামের এক ক্ষতিগ্রস্থ্য নারী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা এবং প্রতারণা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। লিখিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবশ্যই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীন মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, “চিকিৎসার নামে যারা অপচিকিৎসা ও প্রতারণা করছে, তারা সমাজের প্রকাশ্য শত্রু। এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই ভন্ড কবিরাজ মোঃ বাহার হোসেন এবং তার মূল আশ্রয়দাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো অসহায় মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ এমন বাণিজ্য করার সাহস না পায়।
মেঘনার তীর 



















