ঢাকা ১১:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত লক্ষ্মীপুরে নকল ঘির ডিলারকে লাখ টাকা জরিমানা : ৩৫০ কেজি ঘি ধ্বংস লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিককে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় ৬জনকে আসামী করে থানায় মামলা, দুই মামলায় গ্রেফতার সন্ত্রাসী সাকিব  দীপ্ত টিভির সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা, বাহিনী প্রধান সাকিবকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে একই পরিবারের তিনজন নিহত রায়পুরে মাদকাসক্ত যুবকের দেয়া আগুনে পুড়ে গেছে ১১টি বসতঘরসহ৬ দোকান,অভিযুক্তকে গনপিটুনি উৎসাহ-উদ্দীপনায় শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী উদযাপিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ :স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জাতীয়তাবাদের নতুন রাজনীতি সৃষ্টি করেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: পানিসম্পদমন্ত্রী

লক্ষ্মীপুর-রায়পুর আঞ্চলিক মহাসড়ক হকারদের দখল.যাত্রীদের ভোগান্তি

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ১১:৫১:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • 85

মো.জহির উদ্দিন: লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের মাঝামাঝি রয়েছে আঞ্চলিক মহাসড়ক। শরিয়তপুর,মাদারিপুর, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, রাজশাহী তথা দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সমূহের অনেক যানবাহনই লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে চলাচলের এটি একটি প্রধান ও ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়ক। যার অবস্থান রায়পুর পৌরসভাস্থ বাজারের মধ্য দিয়ে। বাজারের উত্তর মাথা থেকে দক্ষিণে রায়পুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল পর্যন্ত মাত্র ৫-৬’শ গজ রাস্তা অতিক্রম করতে অনেক সময় ৩০-৪০ মিনিটের যানজটে পড়তে হয় যানবাহন সমূহকে। আর এর কারণ- অপ্রশস্ত রাস্তা এবং রাস্তার দু’পাশে ফুটপাতের উপর দোকান, ফুটপাতের পরে রাস্তার উপর ভ্যান ব্যবসায়ীদের মালামালের ভ্যানের অবস্থান।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের এ সড়কের নকশা পর্যেবক্ষণ করে দেখা যায়- এ সড়কটির পূর্ব পার্শ্বে নির্মিত সকল দোকান ও ভবনসমূহই সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১২ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত জায়গা দখল করে নির্মিত হয়েছে। এতে রাস্তার মূল নকশার একটি বিরাট অংশই পূর্ব পাশের্^র জমির মালিকদের দখলে চলে গিয়েছে। তার উপর আবার এই সংকুচিত রাস্তার পাশর্^স্থ পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্মিত নির্ধারিত ফুটপাতও দখল করে রেখেছে তারা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই রাস্তার পাশের হোটেলগুলোর বিরিয়ানির বড় বড় পাতিল, গ্রীল মেশিন ও পরটা ভাজার তাওয়া সহ মালামাল রেখে ফুটপাতকে বানিয়ে ফেলা হয়েছে হোটেল বা দোকানের অংশ। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে ফুটপাতের পরিবর্তে হাঁটতে হচ্ছে সড়কের পিচঢালা অংশ দিয়ে। আর সেই রাস্তার উপরে রাখা ভ্যান ব্যবসায়ীদের ভ্যানগাড়ি এবং রাস্তার উপর মালামাল সাজিয়ে ব্যবসা করা হকারদের কারণে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে পথচারীদের।
অবশ্য বিগত কয়েকবারই সরকার পরিবর্তনের পর লোক দেখানো রাস্তার নকশা পরিমাপের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা গিয়েছে সওজ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। প্রতিবারই নকশা পর্যেবক্ষণ করে এই সড়কের পূর্ব পার্শ্বের দোকান ও বিল্ডিং সমূহের ১২ থেকে ১৪ ফুট ভিতরে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করেছে তারা। স্বাধীনতার পর থেকে এতটুকুই দ্বায়িত্ব পালন করেছে সওজ। আর এরইমধ্যে এক এক করে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পাকা দালান। আশ্চর্যের বিষয় হোল- এসব পাকা দালানসমূহ নির্মিত হয়েছে পৌরসভার নকশা অনুমোদন নিয়ে।
এবিষয়ে সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন- সড়ক ও জনপথ বিভাগের মালিকানাধীন রাস্তা/জমির উপর দালান নির্মাণের নকশার অনুমোদন পৌর কতৃপক্ষ কোন আইনে প্রদান করেছেন?
এই রাস্তার পাশের ভ্যান ব্যবসায়ী ও হকাররা বলেন- তারা দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা করে পৌরসভার খাজনা দিয়ে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এসময় খাজনা বা পৌর টোল আদায়কারী নাম না জানা এক ব্যক্তি বলেন, পৌরসভা থেকে বৈধভাবে ইজারা নেওয়া হয়েছে, আমরা পৌরসভার আইন অনুযায়ীই টোল আদায় করছি।
সচেতন নাগরিকদের এবিষয়ে প্রশ্ন- সড়ক ও জনপথের রাস্তার ইজারা পৌরসভা দেয় কিভাবে?
অনুসন্ধানে জানা যায়, রায়পুর বাজারে প্রায় তিন শতাধিক হকার রয়েছে। তাদের কাছ থেকে পৌরসভার নামে দৈনিক ৫০ থেকে ২’শ টাকা করে খাজনা/টোল আদায় করছেন ইজারাদারের লোকেরা। আর এসব অবৈধ হকারদের কারণে রায়পুর বাজারে দিন-রাতের অধিকাংশ সময়ই লেগে থাকে তীব্র যানজট। এরফলে নাগরিকদের চলাচল করতে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
পথচারীরা ফুটপাতে চলাচলের জায়গা না পেয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু সেখানেও রাস্তা দখল করে হকারদের ব্যবসা ও মোটরসাইকেল, সিএনজি আর ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার পার্কিং। ফলে মানুষ মূল সড়কের প্রায় মাঝামাঝি পথে হেঁটে চলাচল করছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি যান চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা।
রায়পুর বাজারের মূল সড়ক ও প্রতিটি অলিগলিতে ফুটপাত দখল এবং ফুটপাত সংলগ্ন রাস্তার উপর অবৈধভাবে দোকান বসানোর ফলে পথচারীদের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, যা মৌলিক নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন।
জানা যায়, রায়পুর পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রতি বছর বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিভিন্ন বাজার, বাজারের বিভিন্ন অংশ, মালামাল লোড-আনলোড, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্টেশন, গণশৌচাগার, রাস্তার উপর বসে ব্যবসা পরিচালনা করা হকারদের কাছে থেকে আদায়ের নিমিত্তে “ইজারা বিজ্ঞপ্তি” এর মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকার ইজারা প্রদান করা হয়।
ইজারাদাররা ইজারা প্রাপ্তির পর নিজেদের ইচ্ছেমত চালান টোল/খাজনা আদায় করে। বাজারজুড়ে অবৈধভাবে রাস্তার উপর বসে বা ভ্যানগাড়িতে করে ব্যবসা করা হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা করে পৌরসভার খাজনা আদায় করে তাদের দিয়েছেন বৈধতা। তাছাড়া পুরো রায়পুর শহরে কোন নির্ধারিত সিএনজি স্ট্যান্ড না থাকা স্বত্তেও রাস্তার উপর অবৈধভাবে সিএনজি দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করা সিএনজি সমূহের চলকদের কাছে থেকে দৈনিক ২০ টাকা করে পৌর টোল আদায় করা হচ্ছে। ফলে রাস্তার উপরই স্বীকৃতি লাভ করেছে সিএনজি স্ট্যান্ড। যা যানজটের একটি প্রধান কারণ।
“বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?” প্রবাদ বাক্যটি এখন রায়পুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে জনসাধারণের ভাবনার বিষয়। প্রধান সড়কের উপর অবস্থিত রায়পুর থানা ভবন। আর হাস্যকর বিষয় হোল এই থানা ভবনের উন্মুক্ত দু’পাশই অবৈধদের দখলে। থানার মূল ফটকের পূর্ব পাশের্^র আঞ্চলিক মহা সড়কের দু’পাশেই সিএনজি, অটোরিকশা, ফুটপাতের দোকান ও ভ্যান ব্যবসায়ীদের রমরমা অবস্থান। থানার প্রধান ফটকের মাত্র ১৫/১৬ গজ দক্ষিণে প্রধান সড়কের পাশের্^ নির্মিত যাত্রী ছাউনীতে অবৈধভাবে অবস্থান করছে একটি দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার। প্রতিনিয়ত সেই কাউন্টারের সামনে বাস থামিয়ে রেখে করা হয় যাত্রী উঠা-নামা। তাছাড়া এই থানা ভবনের ২৫/৩০ গজ দক্ষিণে অবস্থিত রায়পুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ভিতরে নেই কোন বাস কাউন্টার। ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ প্রতিটি জেলার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া বাস রুটের পরিবহনের অফিস/কাউন্টার বাস টার্মিনালের পূর্ব পাশের্^র প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত। ফলে তারা রাস্তার পিচঢালা অংশে বাস রেখে নিয়মিত যাত্রী উঠা-নামা করান।
তাছাড়া থানার সম্মুখের উত্তর পাশে রাস্তার উপর চা-পান-সিগারেটের দোকান, ডিমের দোকান সহ ৬/৭টি দোকান ৭/৮টি ভ্যানগাড়ি যেভাবে দীর্ঘদিন যাবত স্থায়ীভাবে ব্যবসা করে আসছে তা দেখে মনেহয় যেন তাদের স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে।
নাগরিকরা আশা করেছেন- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখবেন।
ফুটপাতের হকার এবং ভ্যানগাড়িতে ব্যবসা পরিচালনাকারী করেন কয়েকজন বলেন, ‘আমরা ছোট ব্যবসা করতে গিয়েও এলাকার নেতা, লাইনম্যান, এমনকি পুলিশের দালালদের প্রতিদিন টাকা দিতে হয়। তবে বছরে দু’একবার সাংবাদিকদের লেখালেখিতে সরকার থেকে চাপ আসলে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট উঠিয়ে দেয়। তা-ও আবার দু’চার ঘন্টা বা সর্বোচ্চ একদিনের জন্য।
রায়পুর থানার বিপরীতে রাস্তার পাশে স্থায়ীভাবে ট্যুল-চেয়ার বিছিয়ে ভ্যানগাড়িতে করে হালিম বিক্রেতা বিল্লাল হোসেন বলেন, আমি হাত পাখার ইসলামী আন্দোলনের নেতা। আজ ১০/১২বছর যাবত এই একই স্থানে ব্যবসা করে আসছি। খুনি হাসিনার আমলেই কেউ আমাকে এখান থেকে উঠাতে পারেনি। আর এখনতো প্রশ্নই আসেনা। আমার উপরের লেভেলে লোক আছে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট শাহীন মিয়া বলেন, ‘রায়পুর শহরের অধিকাংশ রাস্তার পাশে ফুটপাতে এবং ভ্যানগাড়ির হকারদের অবস্থান। এটাই যানজটের মূল কারণ। তাছাড়া মানুষ মূল রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। যানজটের আরেকটি প্রধান কারণ হোল মাত্রাতিরিক্ত অটোরিকশা। এসব হকার ও অটো চালকদের তো কিছু করে সংসার চালাতে হবে। তাই আমরা তাদের কিছু ছাড় দিই।
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, ‘রাস্তার উপর সিএনজি ও অটোরিকশার অঘোষিত স্ট্যান্ড, ফুটপাতের হকার, ভ্যান ব্যবসায়ীদের জন্য মূল রাস্তা সংকুচিত হয়ে গেছে। সঙ্গে যানজটও বাড়ছে। এসব সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করি। পাশাপাশি দ্রুত শহরের চার কোনায় অন্তত চারটি সিএনজি স্ট্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার দাবী জানাচ্ছি।
রায়পুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলাম মিঠু বলেন, নোয়াখালী থেকে মহাসড়কের চার লেনের কাজ চলমান আছে। এই চার লেনের রাস্তা রায়পুর হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তাই দ্রুত সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তার অবৈধ স্থাপনা সমূহ ভেঙ্গে ফেলে রাস্তার প্রসস্থ বৃদ্ধি করলে রায়পুরের যানজটের নিরসন ঘটবে।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য রায়পুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মেহেদী হাসান কাউছার বলেন,পৌরসভার মেইন রোড কিংবা শাখা রাস্তা ইজারা দেওয়া হয়না। এখানে পৌরসভার নামে সিএনজি,ভ্রাম্যমান হকার কিংবা ভ্যানগাড়ি থেকে কোন টাকা নেওয়া হয়না। হকাররা টিকে থাকার জন্য হয়তো কাউকে অর্থ দিয়ে থাকে। এছাড়া ফুটপাত দখল করে কিছু কিছু রেস্টুরেন্ট মালামাল রেখে অবৈধভাবে দখল করে রাখে। এ বিষয়ে আমরা কয়েকবার অভিযান চালিয়ে হাড়ি,পাতিলসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করেছিলাম,যা পরবর্তিতে বিভিন্ন এতিমখানায় দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও হকারদের পুনর্বাসনের জন্য আমরা একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি হকার্স মার্কেট করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

লক্ষ্মীপুরের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তা পৌরসভা ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা রাখেনা, আমরা রায়পুরের আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা গুলির তালিকা তৈরি করছি। এই বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত

লক্ষ্মীপুর-রায়পুর আঞ্চলিক মহাসড়ক হকারদের দখল.যাত্রীদের ভোগান্তি

আডেট সময় ১১:৫১:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

মো.জহির উদ্দিন: লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের মাঝামাঝি রয়েছে আঞ্চলিক মহাসড়ক। শরিয়তপুর,মাদারিপুর, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, রাজশাহী তথা দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সমূহের অনেক যানবাহনই লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে চলাচলের এটি একটি প্রধান ও ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়ক। যার অবস্থান রায়পুর পৌরসভাস্থ বাজারের মধ্য দিয়ে। বাজারের উত্তর মাথা থেকে দক্ষিণে রায়পুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল পর্যন্ত মাত্র ৫-৬’শ গজ রাস্তা অতিক্রম করতে অনেক সময় ৩০-৪০ মিনিটের যানজটে পড়তে হয় যানবাহন সমূহকে। আর এর কারণ- অপ্রশস্ত রাস্তা এবং রাস্তার দু’পাশে ফুটপাতের উপর দোকান, ফুটপাতের পরে রাস্তার উপর ভ্যান ব্যবসায়ীদের মালামালের ভ্যানের অবস্থান।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের এ সড়কের নকশা পর্যেবক্ষণ করে দেখা যায়- এ সড়কটির পূর্ব পার্শ্বে নির্মিত সকল দোকান ও ভবনসমূহই সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১২ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত জায়গা দখল করে নির্মিত হয়েছে। এতে রাস্তার মূল নকশার একটি বিরাট অংশই পূর্ব পাশের্^র জমির মালিকদের দখলে চলে গিয়েছে। তার উপর আবার এই সংকুচিত রাস্তার পাশর্^স্থ পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্মিত নির্ধারিত ফুটপাতও দখল করে রেখেছে তারা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই রাস্তার পাশের হোটেলগুলোর বিরিয়ানির বড় বড় পাতিল, গ্রীল মেশিন ও পরটা ভাজার তাওয়া সহ মালামাল রেখে ফুটপাতকে বানিয়ে ফেলা হয়েছে হোটেল বা দোকানের অংশ। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে ফুটপাতের পরিবর্তে হাঁটতে হচ্ছে সড়কের পিচঢালা অংশ দিয়ে। আর সেই রাস্তার উপরে রাখা ভ্যান ব্যবসায়ীদের ভ্যানগাড়ি এবং রাস্তার উপর মালামাল সাজিয়ে ব্যবসা করা হকারদের কারণে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে পথচারীদের।
অবশ্য বিগত কয়েকবারই সরকার পরিবর্তনের পর লোক দেখানো রাস্তার নকশা পরিমাপের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা গিয়েছে সওজ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। প্রতিবারই নকশা পর্যেবক্ষণ করে এই সড়কের পূর্ব পার্শ্বের দোকান ও বিল্ডিং সমূহের ১২ থেকে ১৪ ফুট ভিতরে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করেছে তারা। স্বাধীনতার পর থেকে এতটুকুই দ্বায়িত্ব পালন করেছে সওজ। আর এরইমধ্যে এক এক করে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পাকা দালান। আশ্চর্যের বিষয় হোল- এসব পাকা দালানসমূহ নির্মিত হয়েছে পৌরসভার নকশা অনুমোদন নিয়ে।
এবিষয়ে সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন- সড়ক ও জনপথ বিভাগের মালিকানাধীন রাস্তা/জমির উপর দালান নির্মাণের নকশার অনুমোদন পৌর কতৃপক্ষ কোন আইনে প্রদান করেছেন?
এই রাস্তার পাশের ভ্যান ব্যবসায়ী ও হকাররা বলেন- তারা দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা করে পৌরসভার খাজনা দিয়ে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এসময় খাজনা বা পৌর টোল আদায়কারী নাম না জানা এক ব্যক্তি বলেন, পৌরসভা থেকে বৈধভাবে ইজারা নেওয়া হয়েছে, আমরা পৌরসভার আইন অনুযায়ীই টোল আদায় করছি।
সচেতন নাগরিকদের এবিষয়ে প্রশ্ন- সড়ক ও জনপথের রাস্তার ইজারা পৌরসভা দেয় কিভাবে?
অনুসন্ধানে জানা যায়, রায়পুর বাজারে প্রায় তিন শতাধিক হকার রয়েছে। তাদের কাছ থেকে পৌরসভার নামে দৈনিক ৫০ থেকে ২’শ টাকা করে খাজনা/টোল আদায় করছেন ইজারাদারের লোকেরা। আর এসব অবৈধ হকারদের কারণে রায়পুর বাজারে দিন-রাতের অধিকাংশ সময়ই লেগে থাকে তীব্র যানজট। এরফলে নাগরিকদের চলাচল করতে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
পথচারীরা ফুটপাতে চলাচলের জায়গা না পেয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু সেখানেও রাস্তা দখল করে হকারদের ব্যবসা ও মোটরসাইকেল, সিএনজি আর ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার পার্কিং। ফলে মানুষ মূল সড়কের প্রায় মাঝামাঝি পথে হেঁটে চলাচল করছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি যান চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা।
রায়পুর বাজারের মূল সড়ক ও প্রতিটি অলিগলিতে ফুটপাত দখল এবং ফুটপাত সংলগ্ন রাস্তার উপর অবৈধভাবে দোকান বসানোর ফলে পথচারীদের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, যা মৌলিক নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন।
জানা যায়, রায়পুর পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রতি বছর বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিভিন্ন বাজার, বাজারের বিভিন্ন অংশ, মালামাল লোড-আনলোড, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্টেশন, গণশৌচাগার, রাস্তার উপর বসে ব্যবসা পরিচালনা করা হকারদের কাছে থেকে আদায়ের নিমিত্তে “ইজারা বিজ্ঞপ্তি” এর মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকার ইজারা প্রদান করা হয়।
ইজারাদাররা ইজারা প্রাপ্তির পর নিজেদের ইচ্ছেমত চালান টোল/খাজনা আদায় করে। বাজারজুড়ে অবৈধভাবে রাস্তার উপর বসে বা ভ্যানগাড়িতে করে ব্যবসা করা হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা করে পৌরসভার খাজনা আদায় করে তাদের দিয়েছেন বৈধতা। তাছাড়া পুরো রায়পুর শহরে কোন নির্ধারিত সিএনজি স্ট্যান্ড না থাকা স্বত্তেও রাস্তার উপর অবৈধভাবে সিএনজি দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করা সিএনজি সমূহের চলকদের কাছে থেকে দৈনিক ২০ টাকা করে পৌর টোল আদায় করা হচ্ছে। ফলে রাস্তার উপরই স্বীকৃতি লাভ করেছে সিএনজি স্ট্যান্ড। যা যানজটের একটি প্রধান কারণ।
“বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?” প্রবাদ বাক্যটি এখন রায়পুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে জনসাধারণের ভাবনার বিষয়। প্রধান সড়কের উপর অবস্থিত রায়পুর থানা ভবন। আর হাস্যকর বিষয় হোল এই থানা ভবনের উন্মুক্ত দু’পাশই অবৈধদের দখলে। থানার মূল ফটকের পূর্ব পাশের্^র আঞ্চলিক মহা সড়কের দু’পাশেই সিএনজি, অটোরিকশা, ফুটপাতের দোকান ও ভ্যান ব্যবসায়ীদের রমরমা অবস্থান। থানার প্রধান ফটকের মাত্র ১৫/১৬ গজ দক্ষিণে প্রধান সড়কের পাশের্^ নির্মিত যাত্রী ছাউনীতে অবৈধভাবে অবস্থান করছে একটি দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার। প্রতিনিয়ত সেই কাউন্টারের সামনে বাস থামিয়ে রেখে করা হয় যাত্রী উঠা-নামা। তাছাড়া এই থানা ভবনের ২৫/৩০ গজ দক্ষিণে অবস্থিত রায়পুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ভিতরে নেই কোন বাস কাউন্টার। ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ প্রতিটি জেলার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া বাস রুটের পরিবহনের অফিস/কাউন্টার বাস টার্মিনালের পূর্ব পাশের্^র প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত। ফলে তারা রাস্তার পিচঢালা অংশে বাস রেখে নিয়মিত যাত্রী উঠা-নামা করান।
তাছাড়া থানার সম্মুখের উত্তর পাশে রাস্তার উপর চা-পান-সিগারেটের দোকান, ডিমের দোকান সহ ৬/৭টি দোকান ৭/৮টি ভ্যানগাড়ি যেভাবে দীর্ঘদিন যাবত স্থায়ীভাবে ব্যবসা করে আসছে তা দেখে মনেহয় যেন তাদের স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে।
নাগরিকরা আশা করেছেন- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখবেন।
ফুটপাতের হকার এবং ভ্যানগাড়িতে ব্যবসা পরিচালনাকারী করেন কয়েকজন বলেন, ‘আমরা ছোট ব্যবসা করতে গিয়েও এলাকার নেতা, লাইনম্যান, এমনকি পুলিশের দালালদের প্রতিদিন টাকা দিতে হয়। তবে বছরে দু’একবার সাংবাদিকদের লেখালেখিতে সরকার থেকে চাপ আসলে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট উঠিয়ে দেয়। তা-ও আবার দু’চার ঘন্টা বা সর্বোচ্চ একদিনের জন্য।
রায়পুর থানার বিপরীতে রাস্তার পাশে স্থায়ীভাবে ট্যুল-চেয়ার বিছিয়ে ভ্যানগাড়িতে করে হালিম বিক্রেতা বিল্লাল হোসেন বলেন, আমি হাত পাখার ইসলামী আন্দোলনের নেতা। আজ ১০/১২বছর যাবত এই একই স্থানে ব্যবসা করে আসছি। খুনি হাসিনার আমলেই কেউ আমাকে এখান থেকে উঠাতে পারেনি। আর এখনতো প্রশ্নই আসেনা। আমার উপরের লেভেলে লোক আছে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট শাহীন মিয়া বলেন, ‘রায়পুর শহরের অধিকাংশ রাস্তার পাশে ফুটপাতে এবং ভ্যানগাড়ির হকারদের অবস্থান। এটাই যানজটের মূল কারণ। তাছাড়া মানুষ মূল রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। যানজটের আরেকটি প্রধান কারণ হোল মাত্রাতিরিক্ত অটোরিকশা। এসব হকার ও অটো চালকদের তো কিছু করে সংসার চালাতে হবে। তাই আমরা তাদের কিছু ছাড় দিই।
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, ‘রাস্তার উপর সিএনজি ও অটোরিকশার অঘোষিত স্ট্যান্ড, ফুটপাতের হকার, ভ্যান ব্যবসায়ীদের জন্য মূল রাস্তা সংকুচিত হয়ে গেছে। সঙ্গে যানজটও বাড়ছে। এসব সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করি। পাশাপাশি দ্রুত শহরের চার কোনায় অন্তত চারটি সিএনজি স্ট্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার দাবী জানাচ্ছি।
রায়পুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলাম মিঠু বলেন, নোয়াখালী থেকে মহাসড়কের চার লেনের কাজ চলমান আছে। এই চার লেনের রাস্তা রায়পুর হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তাই দ্রুত সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তার অবৈধ স্থাপনা সমূহ ভেঙ্গে ফেলে রাস্তার প্রসস্থ বৃদ্ধি করলে রায়পুরের যানজটের নিরসন ঘটবে।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য রায়পুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মেহেদী হাসান কাউছার বলেন,পৌরসভার মেইন রোড কিংবা শাখা রাস্তা ইজারা দেওয়া হয়না। এখানে পৌরসভার নামে সিএনজি,ভ্রাম্যমান হকার কিংবা ভ্যানগাড়ি থেকে কোন টাকা নেওয়া হয়না। হকাররা টিকে থাকার জন্য হয়তো কাউকে অর্থ দিয়ে থাকে। এছাড়া ফুটপাত দখল করে কিছু কিছু রেস্টুরেন্ট মালামাল রেখে অবৈধভাবে দখল করে রাখে। এ বিষয়ে আমরা কয়েকবার অভিযান চালিয়ে হাড়ি,পাতিলসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করেছিলাম,যা পরবর্তিতে বিভিন্ন এতিমখানায় দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও হকারদের পুনর্বাসনের জন্য আমরা একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি হকার্স মার্কেট করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

লক্ষ্মীপুরের সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তা পৌরসভা ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা রাখেনা, আমরা রায়পুরের আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা গুলির তালিকা তৈরি করছি। এই বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।