ঢাকা ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত লক্ষ্মীপুরে নকল ঘির ডিলারকে লাখ টাকা জরিমানা : ৩৫০ কেজি ঘি ধ্বংস লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিককে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় ৬জনকে আসামী করে থানায় মামলা, দুই মামলায় গ্রেফতার সন্ত্রাসী সাকিব  দীপ্ত টিভির সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা, বাহিনী প্রধান সাকিবকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্মীপুরে পানিতে ডুবে একই পরিবারের তিনজন নিহত রায়পুরে মাদকাসক্ত যুবকের দেয়া আগুনে পুড়ে গেছে ১১টি বসতঘরসহ৬ দোকান,অভিযুক্তকে গনপিটুনি উৎসাহ-উদ্দীপনায় শ্রী কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী উদযাপিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ :স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জাতীয়তাবাদের নতুন রাজনীতি সৃষ্টি করেছেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: পানিসম্পদমন্ত্রী

শিশু রামিসা হত্যা: বিচারহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া শৈশব

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ০৭:১০:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
  • 164
একটি শিশুর হাসি একটি সমাজের নির্মলতার প্রতীক। সেই নিষ্পাপ মুখ যখন ধর্ষণ ও হত্যার মতো নৃশংসতার শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়—সমগ্র সমাজের বিবেক রক্তাক্ত হয়। শিশু রামিসার মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার সামনে এক নির্মম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে—আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের জন্য নিরাপদ একটি দেশ গড়তে পেরেছি ?
রামিসা কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যের উপকরণও নয়। সে ছিল একটি স্বপ্ন, একটি পরিবারের আদরের সন্তান, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কিন্তু পৈশাচিক লালসা ও মানবিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে তার জীবন নিভে গেছে নির্মমভাবে। এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রিক ব্যর্থতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
বর্তমান বাস্তবতায় শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় ধর্ষণ, হত্যা, নিখোঁজ কিংবা নির্যাতনের খবর যেন নিয়মিত শিরোনাম হয়ে উঠছে। অথচ অধিকাংশ ঘটনায় বিচার দীর্ঘসূত্রিতার ফাঁদে আটকে যায়। অনেক অপরাধী রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা ক্ষমতার আশ্রয়ে আইনের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ফলাফল—অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
রামিসার ঘটনাও আমাদের সেই পুরনো বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। সমাজে যখন অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার বেশি অসহায় হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের বিচার কাঠামো দুর্বল হয়ে গেছে। বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই অপরাধীদের প্রতি এক ধরনের নীরব প্রশ্রয়। আর এই প্রশ্রয়ই ভবিষ্যতের আরও ভয়াবহ অপরাধের জন্ম দেয়।
একটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা কখনোই শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়; এটি সামাজিক মূল্যবোধেরও চরম অবক্ষয়। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, সমাজে মানবিক চর্চা ও রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের অভাব মিলেই এমন বিকৃত মানসিকতার জন্ম দেয়। যখন অপরাধীরা দেখে শাস্তি অনিশ্চিত, তখন তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে না। ফলে সভ্যতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পশুত্ব আরও উন্মুক্ত হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রের উচিত রামিসার ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা। শুধু গ্রেপ্তার বা আশ্বাস দিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব নয়। এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী একটি শিশুর দিকে কু-দৃষ্টি দেওয়ার আগেই আতঙ্ক অনুভব করে। পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ও প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, যাতে বিচার নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।
একই সঙ্গে সমাজকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। আমাদের পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো কি সত্যিই মানবিক মূল্যবোধ গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে? প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক, অসুস্থ সংস্কৃতি ও নৈতিক অবক্ষয় তরুণ সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে—তা নিয়েও ভাবতে হবে।
রামিসার মৃত্যু কোনো পরিবারের একার কান্না নয়; এটি পুরো জাতির ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি। যদি এই ঘটনার পরও রাষ্ট্র, সমাজ ও বিচার ব্যবস্থা জেগে না ওঠে, তবে আগামী দিনে আরও অনেক রামিসা একই নিষ্ঠুর পরিণতির শিকার হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার উঁচু ভবন বা উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়; বরং সে রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করে। আজ সময় এসেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার। নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদার টাকার জন্য দোকানে ও ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার চেষ্টা, তিন ব্যবসায়ী আহত

শিশু রামিসা হত্যা: বিচারহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া শৈশব

আডেট সময় ০৭:১০:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
একটি শিশুর হাসি একটি সমাজের নির্মলতার প্রতীক। সেই নিষ্পাপ মুখ যখন ধর্ষণ ও হত্যার মতো নৃশংসতার শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়—সমগ্র সমাজের বিবেক রক্তাক্ত হয়। শিশু রামিসার মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার সামনে এক নির্মম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে—আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের জন্য নিরাপদ একটি দেশ গড়তে পেরেছি ?
রামিসা কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যের উপকরণও নয়। সে ছিল একটি স্বপ্ন, একটি পরিবারের আদরের সন্তান, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কিন্তু পৈশাচিক লালসা ও মানবিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে তার জীবন নিভে গেছে নির্মমভাবে। এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রিক ব্যর্থতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
বর্তমান বাস্তবতায় শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় ধর্ষণ, হত্যা, নিখোঁজ কিংবা নির্যাতনের খবর যেন নিয়মিত শিরোনাম হয়ে উঠছে। অথচ অধিকাংশ ঘটনায় বিচার দীর্ঘসূত্রিতার ফাঁদে আটকে যায়। অনেক অপরাধী রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা ক্ষমতার আশ্রয়ে আইনের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ফলাফল—অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
রামিসার ঘটনাও আমাদের সেই পুরনো বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। সমাজে যখন অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার বেশি অসহায় হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের বিচার কাঠামো দুর্বল হয়ে গেছে। বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই অপরাধীদের প্রতি এক ধরনের নীরব প্রশ্রয়। আর এই প্রশ্রয়ই ভবিষ্যতের আরও ভয়াবহ অপরাধের জন্ম দেয়।
একটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা কখনোই শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়; এটি সামাজিক মূল্যবোধেরও চরম অবক্ষয়। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, সমাজে মানবিক চর্চা ও রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের অভাব মিলেই এমন বিকৃত মানসিকতার জন্ম দেয়। যখন অপরাধীরা দেখে শাস্তি অনিশ্চিত, তখন তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে না। ফলে সভ্যতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পশুত্ব আরও উন্মুক্ত হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রের উচিত রামিসার ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা। শুধু গ্রেপ্তার বা আশ্বাস দিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব নয়। এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী একটি শিশুর দিকে কু-দৃষ্টি দেওয়ার আগেই আতঙ্ক অনুভব করে। পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ও প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে, যাতে বিচার নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।
একই সঙ্গে সমাজকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। আমাদের পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো কি সত্যিই মানবিক মূল্যবোধ গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে? প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক, অসুস্থ সংস্কৃতি ও নৈতিক অবক্ষয় তরুণ সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে—তা নিয়েও ভাবতে হবে।
রামিসার মৃত্যু কোনো পরিবারের একার কান্না নয়; এটি পুরো জাতির ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি। যদি এই ঘটনার পরও রাষ্ট্র, সমাজ ও বিচার ব্যবস্থা জেগে না ওঠে, তবে আগামী দিনে আরও অনেক রামিসা একই নিষ্ঠুর পরিণতির শিকার হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার উঁচু ভবন বা উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়; বরং সে রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করে। আজ সময় এসেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার। নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।।