ঢাকা ০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
টার্গেট কিলিংয় আতঙ্ক: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়, বিচারহীনতার দায় কার ? কমলনগরে স্ত্রীর ভিডিও প্রকাশ নিয়ে বিরোধ, কিল-ঘুষি দিয়ে বৃদ্ধকে হত্যার অভিযোগ রুমিনের অভিযোগ নিয়ে যা বলেন ওসি মনজুর কাদের, আগের স্টেশনের কান্ডকীর্তি ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি,যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন আন্দোলনের হুংকার দিবেন না, হুংকার দিয়ে লাভ নেই,রাজপথ থেকে উঠা আসা দল বিএনপি: পানি সম্পদমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি লক্ষ্মীপুরে সারের ৫৭ ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী, বাদ পড়লেন পুরোনো ব্যবসায়ীরা লং মার্চ-রোড মার্চ করে সমাজে অশান্তির চেষ্টা করবেন, সেটা হতে দেয়া হবেনা: পানি সম্পদমন্ত্রী কাঁচাবাজারে আগুন: ‘জীবন এখন এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ, একাধিক কেনার সামর্থ্য নাই’ বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক পা হারায়: রায়পুরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি -বধির আবদুল মান্নানের মাতবেতর জীবন-যাপন

উৎসবের আলো জ্বালাতে গিয়ে নিভে গেল একটি প্রাণ: দায় নেবে কে ?

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ১১:১৩:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
  • 91

এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

উৎসব মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করে, চারপাশকে সাজায় আলোর বর্ণিল আয়োজনে। কিন্তু সেই উৎসবের আলোকসজ্জা করতে গিয়েই যদি কোনো শ্রমিকের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—উৎসবের আয়োজন কতটা নিরাপদ?

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের গোপাল গিরিধারী মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ডেকোরেটর কর্মী কামাল হোসেন (৪৫)। জীবিকার তাগিদে কাজ করতে আসা এই মানুষটির মৃত্যুতে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভরসা ও ভবিষ্যৎ যেন এক মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে গেল।

কামাল হোসেন কোনো আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তিনি ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের একজন প্রতিনিধি—যাঁর ঘাম ঝরে অন্যের আনন্দের আয়োজন সম্পন্ন করতে। তাঁর মতো অসংখ্য শ্রমিক উৎসব, অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনার সাজসজ্জার কাজ করেন। অথচ তাঁদের কাজের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।

একটি প্রাণহানি কি কেবল দুর্ঘটনা, নাকি প্রতিরোধযোগ্য অবহেলার পরিণতি—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। সামান্য অসতর্কতা, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি কিংবা যথাযথ তদারকির অভাব ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তবে রায়পুরের এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের আগে কাউকে দায়ী করা সমীচীন হবে না। সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং কাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করতে হবে।

এখানে মন্দির কর্তৃপক্ষ, ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকর্মী এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা—প্রমাণ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারও অবহেলা বা নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

আমরা দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা জোরদার করি, দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিই। কিন্তু যাঁরা সেই উৎসবকে সুন্দর করে তুলতে দিনরাত পরিশ্রম করেন, তাঁদের নিরাপত্তা কি সমান গুরুত্ব পায়? একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্যও যে উৎসবের আনন্দের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তা ভুলে গেলে চলবে না।

প্রতিটি পূজামণ্ডপে বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, নিরাপদ তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে কাজ করার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী এবং দক্ষ ব্যক্তির তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠান ও আয়োজকদের মধ্যে নিরাপত্তার দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে।

কামাল হোসেনের মৃত্যু ফিরিয়ে আনতে পারবে না কোনো তদন্ত, কোনো ক্ষতিপূরণ কিংবা কোনো আশ্বাস। কিন্তু সুষ্ঠু তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখে পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

উৎসবের সৌন্দর্য শুধু আলোকসজ্জায় নয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেও। যে হাত অন্যের উৎসবকে আলোকিত করে, সেই হাত যেন নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়। কামাল হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সেই মানবিক দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

টার্গেট কিলিংয় আতঙ্ক: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়, বিচারহীনতার দায় কার ?

উৎসবের আলো জ্বালাতে গিয়ে নিভে গেল একটি প্রাণ: দায় নেবে কে ?

আডেট সময় ১১:১৩:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

এস এম আওলাদ হোসেন,সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

উৎসব মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করে, চারপাশকে সাজায় আলোর বর্ণিল আয়োজনে। কিন্তু সেই উৎসবের আলোকসজ্জা করতে গিয়েই যদি কোনো শ্রমিকের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—উৎসবের আয়োজন কতটা নিরাপদ?

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের গোপাল গিরিধারী মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতিকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ডেকোরেটর কর্মী কামাল হোসেন (৪৫)। জীবিকার তাগিদে কাজ করতে আসা এই মানুষটির মৃত্যুতে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভরসা ও ভবিষ্যৎ যেন এক মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে গেল।

কামাল হোসেন কোনো আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তিনি ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের একজন প্রতিনিধি—যাঁর ঘাম ঝরে অন্যের আনন্দের আয়োজন সম্পন্ন করতে। তাঁর মতো অসংখ্য শ্রমিক উৎসব, অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনার সাজসজ্জার কাজ করেন। অথচ তাঁদের কাজের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।

একটি প্রাণহানি কি কেবল দুর্ঘটনা, নাকি প্রতিরোধযোগ্য অবহেলার পরিণতি—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। সামান্য অসতর্কতা, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি কিংবা যথাযথ তদারকির অভাব ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তবে রায়পুরের এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের আগে কাউকে দায়ী করা সমীচীন হবে না। সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং কাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করতে হবে।

এখানে মন্দির কর্তৃপক্ষ, ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকর্মী এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা—প্রমাণ ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারও অবহেলা বা নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

আমরা দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা জোরদার করি, দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিই। কিন্তু যাঁরা সেই উৎসবকে সুন্দর করে তুলতে দিনরাত পরিশ্রম করেন, তাঁদের নিরাপত্তা কি সমান গুরুত্ব পায়? একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্যও যে উৎসবের আনন্দের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তা ভুলে গেলে চলবে না।

প্রতিটি পূজামণ্ডপে বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, নিরাপদ তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে কাজ করার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী এবং দক্ষ ব্যক্তির তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠান ও আয়োজকদের মধ্যে নিরাপত্তার দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে।

কামাল হোসেনের মৃত্যু ফিরিয়ে আনতে পারবে না কোনো তদন্ত, কোনো ক্ষতিপূরণ কিংবা কোনো আশ্বাস। কিন্তু সুষ্ঠু তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখে পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

উৎসবের সৌন্দর্য শুধু আলোকসজ্জায় নয়, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেও। যে হাত অন্যের উৎসবকে আলোকিত করে, সেই হাত যেন নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়। কামাল হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সেই মানবিক দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।