এস এম আওলাদ হোসেন: কোরবানির ঈদ এলেই চামড়া নিয়ে সরকারের নানা পরিকল্পনা, সভা-সেমিনার, মূল্য নির্ধারণ এবং প্রশাসনের তদারকির আশ্বাস শোনা যায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এ বছর লক্ষ্মীপুর জেলায় যা ঘটেছে, তা শুধু একটি জেলার সংকট নয়; এটি দেশের চামড়া খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেটনির্ভর বাজার এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন চিত্র।
চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার রামনগর মাদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসার প্রায় ১৫০টি চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা পুরো ব্যবস্থার অসারতাকে সামনে এনে দিয়েছে। যে চামড়া এতিম শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের অন্যতম উৎস হওয়ার কথা, সেটিই শেষ পর্যন্ত মাটির নিচে চলে গেছে। প্রশ্ন হলো—এ দায় কার ?
সরকার প্রতিবছর চামড়ার ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে। জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসন পর্যন্ত বাজার তদারকির ঘোষণা দেওয়া হয়। লবণের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। চামড়া সংগ্রহকারীরা ক্রেতা পাননি, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসানের ভয়ে পিছিয়ে গেছেন, আর বড় আড়তদারদের নিয়ন্ত্রিত বাজারে দাম নেমে এসেছে অবিশ্বাস্য পর্যায়ে।
একটি গরুর চামড়া যেখানে কয়েকশ থেকে হাজার টাকায় বিক্রির কথা, সেখানে অনেক জায়গায় তা বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০০-১৫০ টাকায়। খাসির চামড়া অনেক ক্ষেত্রে কেউ নিতেই চায়নি। এটি শুধু বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগকে আরও জোরালো করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার খবরই জানেন না। যখন একটি মাদরাসা শতাধিক চামড়া মাটিচাপা দিতে বাধ্য হয়, তখন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অজ্ঞতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদি মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি থাকত, তাহলে এমন ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যেত।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার? শুধু কাগজে মূল্য নির্ধারণ করলেই কি দায়িত্ব শেষ? বাস্তবে যদি সেই মূল্যে কোনো ব্যবসায়ী চামড়া না কেনে, তাহলে সরকারি সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় প্রশাসনের ভূমিকা কেবল বিবৃতি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। অথচ প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার এই জাতীয় সম্পদ অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের কারণে নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাদরাসা, এতিমখানা ও সমাজের অসহায় মানুষ, যারা চামড়া বিক্রির অর্থের ওপর নির্ভরশীল।
এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে শুধু বাজার তদারকি নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্র, আধুনিক সংরক্ষণাগার (কোল্ড স্টোরেজ), পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ এবং সরাসরি ট্যানারির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন জরুরি। একই সঙ্গে চামড়া বাণিজ্যে সক্রিয় সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
লক্ষ্মীপুরের ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—প্রশাসনের সভাকক্ষের সিদ্ধান্ত আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে এখনো বিশাল ব্যবধান রয়েছে। জাতীয় সম্পদ যখন মাটির নিচে চাপা পড়ে, তখন শুধু চামড়া নয়, চাপা পড়ে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং এতিমদের ন্যায্য অধিকারও।
চামড়া মাটিচাপা দেওয়ার এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার প্রতীক। এখন সময় এসেছে দায় এড়িয়ে যাওয়ার নয়, বরং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে চামড়া খাতকে সিন্ডিকেটমুক্ত ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থার আওতায় আনার। অন্যথায় আগামী বছরও হয়তো নতুন কোনো মাদরাসা, নতুন কোনো এতিমখানা তাদের প্রাপ্য অধিকার মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হবে।
মেঘনার তীর 


















