ঢাকা ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সমাজ পুর্নগঠনে সাংবাদিকদের সহযোগীতা চাইলেন সমাজকল্যানমন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী শনিবার ৭৪ দিন পর দেশে ফিরল ইরাকে নিহত প্রবাসী হবি মিয়ার মরদেহ, আহাজারি লাউয়াছড়ায় তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত, সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ লক্ষ্মীপুরে মেঘনার পাড় যেন ‘মিনি কক্সবাজার’ জনসমুদ্র কমলনগরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঈদ পুনর্মিলনী ও মশাল মিছিলের ভিডিও ভাইরাল সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, অপেক্ষা ট্রাম্পের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত না করে, সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী জনগণের অধিকার নিয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে: এমপি বীথিকা বিনতে হোসাইন সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় কমলনগরে যুবকের মৃত্যু, এলাকায় চলছে শোকের মাতম

লক্ষ্মীপুরে মেঘনার পাড় যেন ‘মিনি কক্সবাজার’ জনসমুদ্র

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ১১:৫২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
  • 29

তাবারক হোসেন আজাদ, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর):লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলীয় জনপদ রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলা। বিশাল মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই তিন জনপদে প্রকৃতি যেন উদার হাতে বিলিয়েছে সৌন্দর্য। জেলার ৫টি উপজেলায় ভাল মানের কোন বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিন (শুক্রবার) সন্ধা পর্যন্ত মেঘনা নদীর পাড় যেন এক “মিনিকক্সবাজার” পরিনত হয়েছে। অপরদিকে- অব্যাহত নদীভাঙনের শিকার রায়পুরের চরবংশীর আলতাফ মাষ্টার ঘাট, সাজু মোল্লার ঘাট, সদরের মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ও রামগতির চর আলেকজান্ডার–এর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল মেঘনা নদী।

অপরদিকে-সরকারি ছুটির দি ও ঈদের ছুটিতে জেলা সদরের দালালবাজার জমিরদার বাড়ী, খোয়াসাগর দিঘির পাড় ও রায়পুরের জ্বীনের মসজিদও উপচেপড়া ভীড় লক্ষ করা গেছে।।

রায়পুর প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় গত ৫৪ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোন বিনোদনকেন্দ্র। ভুমি সংক্রান্ত জটিলতায় হাইকোর্টের মামলায় নির্মিত শিশুপার্কটির সব মালামাল চুরি হয়ে গেছে। গত ৫ বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে পার্কটি। উপজেলা পরিষদ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেঘনা নদীর পাড়ে চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লা ও আলতাফ মাষ্টার ঘাট। সদর উপজেলা পরিষদ থেকে বরিশালের ভোলা নৌপথে মজু চৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ১২ কিলোমিটার এবং রামগতি উপজেলা পরিষ ভবন থেকে মাত্র একশ গজ দূরেই নদীর পাড়—দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি।

অন্যদিকে রামগতি উপজেলা আলেকজেন্ডার এলাকা মেঘনার ভাঙন রোধে নির্মিত শক্ত বাঁধ এখন শুধু সুরক্ষাই দিচ্ছে না, তৈরি করেছে নতুন এক প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র। বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। জোয়ার–ভাটার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিনারে। নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাসে ভেসে আসে এক ধরনের নির্মল প্রশান্তি। পিনপতন নীরবতার মাঝে বাতাসের মৃদুশব্দ যেনমন জুড়িয়েদেয়আগত দর্শনার্থীদে।

বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এমন রূপ কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। ঈদের দিনে দুপুর থেকে সন্ধা রাত পর্যন্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড়, চোখে পড়ার মতো।

নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ, জলের মিষ্টি শব্দ—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান অন্যরকম এক প্রশান্তি। বাতাসের দোলায় শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’।

মেঘনা উপকুলীয় এই অঞ্চলে রায়পুর ও সদরে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় পরিবার–পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। কেউ নৌকাভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালুচরে। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্বস্তি—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সন্ধ্যায় ঈদ উপলক্ষে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকুরীজিবী হেলাল আহম্মেদ। তারা বলেন,“জেলা শহরে ভালো কোনো বিনোদনকেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে।এখান প্রকৃতি সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়।”

খুশবু আক্তার নামের এক গৃহবধূ ও কলেজছাত্রী বলেন, “স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে এখানে এসে সমুদ্রসৈকতে ঘোরার মতোই আনন্দ পাচ্ছি। নদীতে এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ইলিশ দেখা যায় না, তবে অন্য সময় জীবন্ত ইলিশও দেখা মেলে। ট্রলারে করে দূরের জেগে ওঠা নতুন চরে ঘুরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর।”

ঈদ উপলক্ষে আশপাশের জেলা থেকেও নানা বয়সী মানুষ ভিড় করছেন এখানে। ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে বলেন,“জেলায় ভালো কোনো পার্ক নেই। তাই ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মেঘনা পাড়ই এখন আমাদের প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন।”

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক সজিব হোসেন জানান, ভয়াবহ ভাঙনে যখন রায়পুরের উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী এবং রামগতির আলেকজান্ডার শহর হুমকির মুখে পড়ে, তখন সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সেই বাঁধে পলি জমে প্রাকৃতিক বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন,“এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। পাশাপাশি অসমাপ্ত বাঁধ নির্মাণ দ্রুত শেষ করা দরকার।”

তবে বিনোদনের এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে শঙ্কা। নদীতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকেরা। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নেয়ামত হোসেন বলেন,“সবাই মিলে ট্রলারে ঘুরেছি, কিন্তু লাইফ জ্যাকেট বা কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীও ছিল অতিরিক্ত। কিছুটা ভয় কাজ করছিল।” গত কয়েকদিন ধরে রায়পুরের ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার প্রশাসনের তহবিল থেকে অর্থ ব্যায় করে চমৎকার পরিবেশে (অসাধারন পর্যটনকেন্দ্র) তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই।

এ বিষয়ে ট্রলারচালক কিরন মাজি বলেন,
“১২ বছর ধরে এই নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার–ভাটা বুঝেই চলাচল করি। জোয়ারের সময় যাত্রী তুলি না। এখনো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।”

মেঘনা পাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন,
“চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনা পাড় এখন অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস—সব একসঙ্গে মিলিয়ে রায়পুর–রামগতির মেঘনা পাড় এখন দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য ভ্রমণগন্তব্য। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন সত্যিই আরেক কক্সবাজার।

Tag :
লেখকের তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সমাজ পুর্নগঠনে সাংবাদিকদের সহযোগীতা চাইলেন সমাজকল্যানমন্ত্রী

লক্ষ্মীপুরে মেঘনার পাড় যেন ‘মিনি কক্সবাজার’ জনসমুদ্র

আডেট সময় ১১:৫২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

তাবারক হোসেন আজাদ, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর):লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূলীয় জনপদ রায়পুর, সদর ও রামগতি উপজেলা। বিশাল মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই তিন জনপদে প্রকৃতি যেন উদার হাতে বিলিয়েছে সৌন্দর্য। জেলার ৫টি উপজেলায় ভাল মানের কোন বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় ঈদের দ্বিতীয় দিন (শুক্রবার) সন্ধা পর্যন্ত মেঘনা নদীর পাড় যেন এক “মিনিকক্সবাজার” পরিনত হয়েছে। অপরদিকে- অব্যাহত নদীভাঙনের শিকার রায়পুরের চরবংশীর আলতাফ মাষ্টার ঘাট, সাজু মোল্লার ঘাট, সদরের মজুচৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ও রামগতির চর আলেকজান্ডার–এর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল মেঘনা নদী।

অপরদিকে-সরকারি ছুটির দি ও ঈদের ছুটিতে জেলা সদরের দালালবাজার জমিরদার বাড়ী, খোয়াসাগর দিঘির পাড় ও রায়পুরের জ্বীনের মসজিদও উপচেপড়া ভীড় লক্ষ করা গেছে।।

রায়পুর প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় গত ৫৪ বছরেও গড়ে ওঠেনি কোন বিনোদনকেন্দ্র। ভুমি সংক্রান্ত জটিলতায় হাইকোর্টের মামলায় নির্মিত শিশুপার্কটির সব মালামাল চুরি হয়ে গেছে। গত ৫ বছর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে পার্কটি। উপজেলা পরিষদ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেঘনা নদীর পাড়ে চরবংশী ইউনিয়নের সাজু মোল্লা ও আলতাফ মাষ্টার ঘাট। সদর উপজেলা পরিষদ থেকে বরিশালের ভোলা নৌপথে মজু চৌধুরীর লঞ্চ ঘাট ১২ কিলোমিটার এবং রামগতি উপজেলা পরিষ ভবন থেকে মাত্র একশ গজ দূরেই নদীর পাড়—দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি।

অন্যদিকে রামগতি উপজেলা আলেকজেন্ডার এলাকা মেঘনার ভাঙন রোধে নির্মিত শক্ত বাঁধ এখন শুধু সুরক্ষাই দিচ্ছে না, তৈরি করেছে নতুন এক প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র। বাঁধের ওপর দাঁড়ালে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। জোয়ার–ভাটার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিনারে। নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া বাতাসে ভেসে আসে এক ধরনের নির্মল প্রশান্তি। পিনপতন নীরবতার মাঝে বাতাসের মৃদুশব্দ যেনমন জুড়িয়েদেয়আগত দর্শনার্থীদে।

বিকেল গড়ালে পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্যাস্ত আর নদীর ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপার্থিব দৃশ্যপট। সোনালি আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। প্রকৃতির এমন রূপ কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো মানুষ। ঈদের দিনে দুপুর থেকে সন্ধা রাত পর্যন্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড়, চোখে পড়ার মতো।

নদীর পাড়ে জেগে ওঠা নতুন বালুর বেলাভূমি, ঢেউয়ের ছন্দ, জলের মিষ্টি শব্দ—সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা খুঁজে পান অন্যরকম এক প্রশান্তি। বাতাসের দোলায় শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেকের কাছেই এটি এখন ‘স্বল্প খরচে স্বর্গীয় ভ্রমণ’।

মেঘনা উপকুলীয় এই অঞ্চলে রায়পুর ও সদরে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় পরিবার–পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। ঈদকে ঘিরে উৎসবের আমেজে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করছেন মেঘনার পাড়ে। কেউ নৌকাভ্রমণে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা পরিবার নিয়ে ছবি তুলছেন বালুচরে। শিশুদের উচ্ছ্বাস আর বড়দের স্বস্তি—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সন্ধ্যায় ঈদ উপলক্ষে রায়পুরের সাজু মোল্লার ঘাটে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসেন চাকুরীজিবী হেলাল আহম্মেদ। তারা বলেন,“জেলা শহরে ভালো কোনো বিনোদনকেন্দ্র নেই। সিনেমা হলগুলোও বহু বছর ধরে বন্ধ। শহরের একঘেয়ে জীবন থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে এসে দারুণ স্বস্তি লাগছে।এখান প্রকৃতি সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়।”

খুশবু আক্তার নামের এক গৃহবধূ ও কলেজছাত্রী বলেন, “স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে এখানে এসে সমুদ্রসৈকতে ঘোরার মতোই আনন্দ পাচ্ছি। নদীতে এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ইলিশ দেখা যায় না, তবে অন্য সময় জীবন্ত ইলিশও দেখা মেলে। ট্রলারে করে দূরের জেগে ওঠা নতুন চরে ঘুরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর।”

ঈদ উপলক্ষে আশপাশের জেলা থেকেও নানা বয়সী মানুষ ভিড় করছেন এখানে। ষাটোর্ধ্ব মহসিন মিয়া নাতি-নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসে বলেন,“জেলায় ভালো কোনো পার্ক নেই। তাই ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মেঘনা পাড়ই এখন আমাদের প্রধান বিনোদনস্থল। তবে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন।”

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক সজিব হোসেন জানান, ভয়াবহ ভাঙনে যখন রায়পুরের উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী এবং রামগতির আলেকজান্ডার শহর হুমকির মুখে পড়ে, তখন সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নদীর পাড়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সেই বাঁধে পলি জমে প্রাকৃতিক বেলাভূমি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন,“এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। পাশাপাশি অসমাপ্ত বাঁধ নির্মাণ দ্রুত শেষ করা দরকার।”

তবে বিনোদনের এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে শঙ্কা। নদীতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ট্রলার ও স্পিডবোটে ঘুরছেন পর্যটকেরা। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা নেয়ামত হোসেন বলেন,“সবাই মিলে ট্রলারে ঘুরেছি, কিন্তু লাইফ জ্যাকেট বা কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীও ছিল অতিরিক্ত। কিছুটা ভয় কাজ করছিল।” গত কয়েকদিন ধরে রায়পুরের ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার প্রশাসনের তহবিল থেকে অর্থ ব্যায় করে চমৎকার পরিবেশে (অসাধারন পর্যটনকেন্দ্র) তৈরি করে দিয়েছেন। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই।

এ বিষয়ে ট্রলারচালক কিরন মাজি বলেন,
“১২ বছর ধরে এই নদীতে ট্রলার চালাই। জোয়ার–ভাটা বুঝেই চলাচল করি। জোয়ারের সময় যাত্রী তুলি না। এখনো বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।”

মেঘনা পাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন,
“চারটি উপজেলার মানুষের কাছে মেঘনা পাড় এখন অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীর বিশালতা, নির্মল বাতাস আর মানুষের প্রাণোচ্ছ্বাস—সব একসঙ্গে মিলিয়ে রায়পুর–রামগতির মেঘনা পাড় এখন দক্ষিণাঞ্চলের এক অনন্য ভ্রমণগন্তব্য। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন সত্যিই আরেক কক্সবাজার।