ঢাকা ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
টার্গেট কিলিংয় আতঙ্ক: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়, বিচারহীনতার দায় কার ? কমলনগরে স্ত্রীর ভিডিও প্রকাশ নিয়ে বিরোধ, কিল-ঘুষি দিয়ে বৃদ্ধকে হত্যার অভিযোগ রুমিনের অভিযোগ নিয়ে যা বলেন ওসি মনজুর কাদের, আগের স্টেশনের কান্ডকীর্তি ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি,যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন আন্দোলনের হুংকার দিবেন না, হুংকার দিয়ে লাভ নেই,রাজপথ থেকে উঠা আসা দল বিএনপি: পানি সম্পদমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি লক্ষ্মীপুরে সারের ৫৭ ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী, বাদ পড়লেন পুরোনো ব্যবসায়ীরা লং মার্চ-রোড মার্চ করে সমাজে অশান্তির চেষ্টা করবেন, সেটা হতে দেয়া হবেনা: পানি সম্পদমন্ত্রী কাঁচাবাজারে আগুন: ‘জীবন এখন এক তরকারিতেই সীমাবদ্ধ, একাধিক কেনার সামর্থ্য নাই’ বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক পা হারায়: রায়পুরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি -বধির আবদুল মান্নানের মাতবেতর জীবন-যাপন

লক্ষ্মীপুরে সারের ৫৭ ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী, বাদ পড়লেন পুরোনো ব্যবসায়ীরা

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ০২:৫৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
  • 33

স্টাফ রিপোর্টার: লক্ষ্মীপুরের ছয় উপজেলায় সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জন। এর মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় প্রভাব খাঁটিয়ে ৪৫জন সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। ফলে দুইদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডিলার থেকে বঞ্চিতসহ দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারন মানুষও।
ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও তা মানা হয়নি । তবে ডিলার হিসেবে মনোনীত বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অনেকেরই সারের ব্যবসার অভিজ্ঞতা নেই। বাদ পড়া অনেক আবেদনকারীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও তাঁরা ডিলার হতে পারেননি। তাদেরকে আওয়ামীলীগের ট্যাগ দিয়ে বাধ দেয়া হয়।

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। এক গুদামে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। লক্ষ্মীপুরে ৫৮টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার জন্য সারের ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল আবেদনের শেষ দিন। ওই সময় পর্যন্ত ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে।

৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের সই করা চিঠিতে ৫৭ জনকে সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত করা ডিলারদের ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিলারদের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। তাঁদের কেউ বিএনপির পদে রয়েছেন, কেউ ছাত্রদল, যুবদল কিংবা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা। এর বাইরে কয়েকজন দলের সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া দলীয় নেতাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন ব্যক্তিও আছেন কয়েকজন। তবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের তালিকায় এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতে যুক্ত।

ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় যা ছিল:

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। এক গুদামে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ।

নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।।

জেলায় ডিলার নিয়োগ পেলেন যাঁরা:

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ। তাঁর প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ।একই উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক মেহেদী হাসান আইনানকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও বামনী ইউনিয়নে মেসার্স আমির হোসেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন ওরফে ছুটু ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি বামনী ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তাদের তিনজনের একজনও সারের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেননা। অথচ তাদের সার ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়। একইভাবে রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স আবদুল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। করপাড়া ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান এস বি ট্রেডার্স। ভোলাকোট ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ। সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মালিক জাকির হোসেনকে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি দালাল বাজার ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। প্রতিষ্ঠানটি রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসা করেন। কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ইয়ামিন ট্রেডার্সের মো. ইসমাইল ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের ভাই। চর মার্টিন ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব গিয়াস উদ্দিন। চর ফলকন ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন মাহবুবুর রহমান। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর আত্মীয় বলে জানা গেছে। তাঁর চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন পাটারীর প্রতিষ্ঠানও পাটারীরহাট ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। এইভাবে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি ও তার সহযোগিড় সংগঠনের ৪৫ নেতাকর্মী।

দীর্ঘদিন ধরে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলায় চন্দ্রগঞ্জ বাজারে সার বিক্রি করে আসছেন মো. শোভন। সারের ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু মনোনীত ডিলারদের তালিকায় তাঁর নাম নেই। মো. শোভন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। কি কারনে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে,সেটাও জানিনা। অথচ সকল নিয়ম-কানুন মেনে আবেদন করছি। আমি কোন রাজনীতিক দলের সাথে জড়িত নয়। বিএনপি করলে হয়তো ডিলার পেতাম।

চরলরেঞ্চ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন, কি কারনে আমার ডিলার বাধ গেল জানিনা। দীর্ঘদিন সার ডিলার ছিল। আমাকে না দেয়ার কারন কি সেটাও জানিনা।

কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নে সার ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন একই ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান যুবদল নেতা তারেক রহমান। তাঁর দাবি, পৈতৃক সূত্রেই তাঁদের পরিবার সার ও কীটনাশকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের প্রতিষ্ঠান এর আগে সারের ডিলার ছিল। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তা বাতিল হয়। তাঁদের সার ব্যবসার বয়স প্রায় ৫০ বছর। এবার তিনি ডিলার হতে আবেদন করেও মনোনীত হননি। যাঁদের মনোনীত করা হয়েছে, তাঁদের গুদাম নেই। এমনকি অনেকেরই নেই সার বিক্রির অভিজ্ঞতা। এতে প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়,অর্থের বিনিময়।

রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন পলাশ বলেন, সকল নিয়ম কানুন-মেনে আবেদন করি। যাচই-বাছাই করে মনোনীত করা হয়েছে। আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও রাজনৈতিক তদবির ছিল না।’

কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তাঁকে মনোনীত করেছে। তবে তিনি আগে কখনো সারের ব্যবসা করেননি। ব্যবসা করলে দোষের কি।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব থাকা লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, সরকারী নিয়ম কানুন-মেনে সার ডিলার মনোনীত করতে সুপারিশ করা হয়।

লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল। পরে সেই তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত করে তালিকা পাঠানো হয়েছে। কোন অনিয়ম করা হয়নি।

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমাদের দলের নেতা-কর্মীরা সারের ডিলারসহ বিভিন্ন কিছু থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দল ক্ষমতায় আসার পর এখন অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিচ্ছেন। এ কারণে সারের ডিলারের জন্য তাঁরা আবেদন করেছেন। সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের কোনো প্রভাব ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী সার ডিলার মনোনীত হয়েছে। কোন ধরনের অনিয়ম ও প্রভাব ছিলনা।

Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

টার্গেট কিলিংয় আতঙ্ক: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়, বিচারহীনতার দায় কার ?

লক্ষ্মীপুরে সারের ৫৭ ডিলারের ৪৫ জনই বিএনপি নেতা-কর্মী, বাদ পড়লেন পুরোনো ব্যবসায়ীরা

আডেট সময় ০২:৫৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার: লক্ষ্মীপুরের ছয় উপজেলায় সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জন। এর মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় প্রভাব খাঁটিয়ে ৪৫জন সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। ফলে দুইদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডিলার থেকে বঞ্চিতসহ দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারন মানুষও।
ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও তা মানা হয়নি । তবে ডিলার হিসেবে মনোনীত বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অনেকেরই সারের ব্যবসার অভিজ্ঞতা নেই। বাদ পড়া অনেক আবেদনকারীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও তাঁরা ডিলার হতে পারেননি। তাদেরকে আওয়ামীলীগের ট্যাগ দিয়ে বাধ দেয়া হয়।

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। এক গুদামে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। লক্ষ্মীপুরে ৫৮টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার জন্য সারের ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল আবেদনের শেষ দিন। ওই সময় পর্যন্ত ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে।

৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের সই করা চিঠিতে ৫৭ জনকে সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত করা ডিলারদের ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিলারদের মধ্যে ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। তাঁদের কেউ বিএনপির পদে রয়েছেন, কেউ ছাত্রদল, যুবদল কিংবা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা। এর বাইরে কয়েকজন দলের সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া দলীয় নেতাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন ব্যক্তিও আছেন কয়েকজন। তবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের তালিকায় এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতে যুক্ত।

ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় যা ছিল:

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। এক গুদামে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ।

নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।।

জেলায় ডিলার নিয়োগ পেলেন যাঁরা:

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ। তাঁর প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ।একই উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক মেহেদী হাসান আইনানকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও বামনী ইউনিয়নে মেসার্স আমির হোসেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন ওরফে ছুটু ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি বামনী ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তাদের তিনজনের একজনও সারের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেননা। অথচ তাদের সার ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়। একইভাবে রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স আবদুল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। করপাড়া ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান এস বি ট্রেডার্স। ভোলাকোট ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ। সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মালিক জাকির হোসেনকে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি দালাল বাজার ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। প্রতিষ্ঠানটি রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসা করেন। কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ইয়ামিন ট্রেডার্সের মো. ইসমাইল ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের ভাই। চর মার্টিন ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব গিয়াস উদ্দিন। চর ফলকন ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন মাহবুবুর রহমান। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর আত্মীয় বলে জানা গেছে। তাঁর চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন পাটারীর প্রতিষ্ঠানও পাটারীরহাট ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। এইভাবে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি ও তার সহযোগিড় সংগঠনের ৪৫ নেতাকর্মী।

দীর্ঘদিন ধরে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলায় চন্দ্রগঞ্জ বাজারে সার বিক্রি করে আসছেন মো. শোভন। সারের ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু মনোনীত ডিলারদের তালিকায় তাঁর নাম নেই। মো. শোভন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। কি কারনে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে,সেটাও জানিনা। অথচ সকল নিয়ম-কানুন মেনে আবেদন করছি। আমি কোন রাজনীতিক দলের সাথে জড়িত নয়। বিএনপি করলে হয়তো ডিলার পেতাম।

চরলরেঞ্চ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারন সম্পাদক জসিম উদ্দিন বলেন, কি কারনে আমার ডিলার বাধ গেল জানিনা। দীর্ঘদিন সার ডিলার ছিল। আমাকে না দেয়ার কারন কি সেটাও জানিনা।

কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নে সার ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন একই ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান যুবদল নেতা তারেক রহমান। তাঁর দাবি, পৈতৃক সূত্রেই তাঁদের পরিবার সার ও কীটনাশকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের প্রতিষ্ঠান এর আগে সারের ডিলার ছিল। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তা বাতিল হয়। তাঁদের সার ব্যবসার বয়স প্রায় ৫০ বছর। এবার তিনি ডিলার হতে আবেদন করেও মনোনীত হননি। যাঁদের মনোনীত করা হয়েছে, তাঁদের গুদাম নেই। এমনকি অনেকেরই নেই সার বিক্রির অভিজ্ঞতা। এতে প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়,অর্থের বিনিময়।

রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন পলাশ বলেন, সকল নিয়ম কানুন-মেনে আবেদন করি। যাচই-বাছাই করে মনোনীত করা হয়েছে। আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও রাজনৈতিক তদবির ছিল না।’

কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তাঁকে মনোনীত করেছে। তবে তিনি আগে কখনো সারের ব্যবসা করেননি। ব্যবসা করলে দোষের কি।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব থাকা লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, সরকারী নিয়ম কানুন-মেনে সার ডিলার মনোনীত করতে সুপারিশ করা হয়।

লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল। পরে সেই তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত করে তালিকা পাঠানো হয়েছে। কোন অনিয়ম করা হয়নি।

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমাদের দলের নেতা-কর্মীরা সারের ডিলারসহ বিভিন্ন কিছু থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দল ক্ষমতায় আসার পর এখন অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিচ্ছেন। এ কারণে সারের ডিলারের জন্য তাঁরা আবেদন করেছেন। সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের কোনো প্রভাব ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী সার ডিলার মনোনীত হয়েছে। কোন ধরনের অনিয়ম ও প্রভাব ছিলনা।