রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি: আইজকা (আজ) তিন বছর ধরে আমরা এই আশ্রয়কেন্দ্রে বাস করছি। আর (আমার) খুব অসুখ (অসুস্থ)। দিনমজুর হুতের (ছেলের) কাছে থাই (থাকি)। এক দিনের লাই (এক দিনের জন্য) ওষুধ কিনে আনলে বাকি চারদিনেও আর খাইতে হারি না (পারি না)। দুই দিন পর বৃহস্পতিবার (২৮ মে) কুরবানের ঈদ (ঈদুল আজহা)। আঙ্গোরে (আমাদের) যদি সরকার একখান (একটা) গরু দিতেন, তাহলে সবাই মিলেমিশে ভাগ করি খাইতাম।
প্রায় তিন বছর আগে আমাদের পাশের মেঘনা নদীর পাড়ে মিয়ারহাট ও হাজিমারা এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে প্রশাসনের পক্ষে (ইউএনও) গরু জবাই করেছিলেন। কেউ আবার আত্মীয় –স্বজনদের দেওয়া কুরবানির গোশত দিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করেছেন। কেউ সাধ্যের মধ্যে নতুন জামাকাপড় কেনেন। কেউ আবার স্বজনকে দাওয়াত করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম।
সোমবার দুপুরে রায়পুরে দক্ষিণ চরবংশী ইউপির বেপারীর হাটের পাশে কারিমিয়া আশ্রয়কেন্দ্রে সরেজমিন গেলে বৃদ্ধ হাজেরা বেগমসহ কয়েকজন তাদের কষ্ট ও চাহিদার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
গত কয়েকদিন টানা বৃষ্টি–জলাবদ্ধতায় নাকাল অবস্থা, অন্যদিকে- কুরবানি দিতে না পারায় উপজেলার ৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা প্রায় সাড়ে ৪শ পরিবারের কষ্ট নিয়ে এবারের ঈদ কাটবে। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারিভাবে কেউ সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি তাদের জন্য।
মেঘনার পাড়ের কারিমিয়া ও মিয়ারহাটের আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সবার মুখে কষ্টের ছাপ। কোনো রকমে দুই বেলা খেয়ে কঠিন সময় পার করছে বানভাসি ও দরিদ্র মানুষ। ঈদ উদযাপনের চিন্তা কারও মাথায় নেই।
দিনমজুর মন্তাজ হোসেন ও আবদুল মান্নান জানান, ‘১১০ পরিবারের বসবাস এই আশ্রয়কেন্দ্রে। রিমাল ও টানা বৃষ্টিতে পুরো কেন্দ্রেই জলাবদ্ধতা হয়। আমরা গরিব বইলা কেউ আঙ্গো খবর নেয় না।’ তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে মেঘনা নদীর পারের মিয়ারহাট আশ্রয়কেন্দ্রবাসী গরুর গোশত খাইলেও দুই বছরেও আমাদের খোঁজখবর কেউ নেয়নি। বাড়িতে থাকলে গ্রামের লোকজন কুরবানির গোশত দিত। আশ্রয়কেন্দ্রে কে দিব, বলেন?’
আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দা মরহুম মুক্তিযোদ্ধা কন্যা বিধবা হামিদা বেগম বলেন, ‘দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঈদ করতে হবে। এমন কথা কখনো ভাবিনি। নদীভাঙনে বসতঘর হারিয়ে বেড়িবাঁধ থেকে বাবার সঙ্গে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। নিজে পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছি না। এসব যন্ত্রণার মধ্যে ঈদের কথা ভাবছি না।
হাজিমারা আশ্রয়কেন্দ্রের সভাপতি ও দক্ষিন চরবংশি ইউপির গ্রামপুলিশের ছেলে চান মিয়া এপ্রতিবেদককে বলেন,‘আমাদের কেন্দ্রে ২০২২ সালে প্রশাসন থেকে গরুর গোশত দিয়েছিল। দুই বছর মিয়ারহাট আশ্রয়কেন্দ্রে একটা গরু জবাই করেছিল। এই ঈদে এখন পর্যন্ত প্রশাসন বা কোনো জনপ্রতিনিধিই খবর নেয় নাই।’
এ বিষয়ে রায়পুরের ইউএনও মেহেদী হাসান কাউছার ও নবাগত সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারীদের সমস্যাগুলো খুঁজে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে গরু জবাই নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
উল্লেখ্য-রায়পুরের বামনী ইউপির বাংলাবাজার এলাকায় ৯৪, শিবপুরে ১০, কেরোয়া ইউপির মীরগঞ্জ বাজারের পাশে ৯, দক্ষিণ চরবংশী ইউপির মেঘনা নদী সংলগ্ন মিয়ারহাটে ৪৫, হাজিমারায় ৪৪, কারিমিয়ায় এলাকায় ১১১, উত্তর চরবংশী ইউপির কুচিয়ামারায় ২২, মদিনা বাজারে ৪৩, দক্ষিণ চর আবাবিল ইউপির উদমারা গ্রামে ৭৯টিসহ মোট ৪৬৫টি ভূমিহীন পরিবারকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মেঘনার তীর 





















