ঢাকা ০১:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে : রাষ্ট্রপতি প্রথম ফ্লাইট দেশে ফিরলেন ৪৪৫ জন হাজী লক্ষ্মীপুরে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ সমাজ পুর্নগঠনে সাংবাদিকদের সহযোগীতা চাইলেন সমাজকল্যানমন্ত্রী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী শনিবার ৭৪ দিন পর দেশে ফিরল ইরাকে নিহত প্রবাসী হবি মিয়ার মরদেহ, আহাজারি লাউয়াছড়ায় তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত, সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ লক্ষ্মীপুরে মেঘনার পাড় যেন ‘মিনি কক্সবাজার’ জনসমুদ্র কমলনগরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঈদ পুনর্মিলনী ও মশাল মিছিলের ভিডিও ভাইরাল সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, অপেক্ষা ট্রাম্পের

রামগতিতে সীমানা জটিলতায় নাগরিক সেবা বঞ্চিত লক্ষাধিক মানুষ

  • মেঘনার তীর
  • আডেট সময় ১০:৪৯:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
  • 53

আমানত উল্যাহ, রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর): লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল ‘বয়ারচর’। প্রাকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে বাস করলেও এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন সংগ্রামে ভরা। প্রতিনিয়ত নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের। লক্ষাধিক মানুষের বসবাসের এ চরটি নিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া ও লক্ষ্মীপুরর রামগতি উপজেলার সীমানা নিয়ে রয়েছে মামলা-মোকদ্দমা। এ সীমানা জটিলতার অজুহাতে আইনী, মানবিক ও নাগরিক সেবা বঞ্চিত বয়ারচরবাসী।
সরেজমিন ঘুরে চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ জনপদের সীমানা জটিলতা থাকায় কোনো ভালমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিরক্ষর তৈরী হচ্ছে এখানে। একেকটি ওয়ার্ডে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার মানুষ বসবাস করলেও বেশিরভাগ ওয়ার্ডে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। লাখো মানুষের বসবাসের এ চরে নেই কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্রও।

বয়ারচরের দুই দিকে মেঘনা নদী। আর এক দিকে ভুলুয়া নদী। মাঝখানে রামগতি উপজেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী। যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর। কোনো প্রসূতি মা অসুস্থ হলে ২০ কিলোমিটার পাঁড়ি দিয়ে নিতে হয় রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকেও বিচ্ছিন্ন এ চরটি। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময়ে চরটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত। চরের মাঝে অসংখ্য কাঁচা সড়ক থাকলেও এলাকাটি নিয়ে মামলা থাকায় হাতিয়া ও রামগতি উপজেলার কেউ উনয়নমূলক প্রকল্প দিতে আগ্রহী নয়। দু’উপজেলার ঠেলাঠেলিতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত বয়ারচরবাসী। রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্টের অবস্থা একেবারেই নাজুক। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চরটিতে আধিপত্য বিস্তার করছেন একাধিক দস্যুবাহিনী। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ এ চরের নিত্য দিনের ঘটনা।

চরের বাসিন্দারা জানান, বয়ারচরে জলদস্যু, ভূমিদস্যু ও একাধিক ডাকাত বাহিনীর অত্যাচার বন্ধ এবং এলাকাটির স্থায়ী সমাধানের দাবিতে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে আসছেন। তবে , ২০০৭ সালের দায়ের করা মামলায় উচ্চ আদালতে রামগতির পক্ষে রায় হলেও রামগতি উপজেলা প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা বয়ারচরকে অবহেলা করেই চলছে। সরিয়ে নেন দু’টি পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের। বন্ধ করে দেন নাগরিক অধিকার ও মানবিক সহায়তা। মনে হচ্ছে , বয়ারচরকে হাতিয়ার দিকে ইচ্ছা করেই ঠেলে দিচ্ছে তারা। এতে চরের বাসিন্দারা অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন।

তারা জানান, বয়ারচরে যাওয়ার একমাত্র ভরসা নৌপথ ও একটি সড়কপথ। বর্ষা মৌসুমে নদীর উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয় তাদের। জরুরি প্রয়োজনে বিশেষ করে অসুস্থতা বা প্রসবকালীন পরিস্থিতির সময় মূল ভু-খন্ডে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বয়ারচর ব্রিজঘাট এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান জানান, বয়ারচরে দুইটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও ফাঁড়ি দুটিতে কোনো পুলিশ থাকে না। রাজনৈতিক হানাহানি ও চরের একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে জলদস্যু, ভূমিদস্যু, সক্রিয় ডাকাতবাহিনী ও দালাল চক্রের হাতে জিম্মি এ চরটি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণহীন সম্পূর্ণ অরক্ষিত এ চরটির লাখো মানুষ রয়েছে নিরাপত্তাহীনতায়। স্থানীয়রা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। অজুহাত সীমানা বিরোধ। কিন্তু আদালত রামগতির পক্ষে রায় দিলেও রামগতির রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসন অনেকটা অনীহা ভাব দেখাচ্ছে। অন্যদিকে, বয়ারচরের দুইদিক থেকে ভাঙছ নদী। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত এ চরটিতে বসবাসকারীরা চাচ্ছেন স্থায়ী সমাধান।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালে তৎকালীন লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের এমপি আব্দুল্লাহ আল মামুন ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের এমপি মোহাম্মদ আলী বয়ারচরের সীমানা জটিলতা নিরসনের জন্য দুই জেলা প্রশাসক নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করেও সমাধানে পৌঁছাত পারেননি।

বয়ারচরের তেগাছিয়া এলাকার বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক শরীফ মাহমুদ বলেন, এ চরটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল। আমাদের দু’পাশে দুই উপজেলা। রামগতি ও হাতিয়া। সীমানা জটিলতার অজুহাতে প্রশাাসন আমাদের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। এতে সব ধরনের নাগরিক ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।হচ্ছে বয়ারচরের মানুষ।
তিনি বলেন, বয়ারচরের মানুষ অবহেলিত। আমরা আইনী ও নাগরিক অধিকার পেতে রামগতি গেলে তারা বলে তোমরা হাতিয়া যাও। আবার হাতিয়ায় গেলে বলা হয় তোমরা রামগতির ভোটার সেখানে যাও। এ মারপ্যাচে সব ধরনের আইনী ও নাগরিক অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত।

সেখানকার আরেক বাসিন্দা মো. মামুন বলেন, বাংলাদশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মূল্য থাকলেও আমাদের তাও নেই। কোনো ঝামেলা হলে দুই উপজেলা পরিষদ ও থানায় গেলে কোনো মূল্য পাওয়া যায় না। তারা এক পক্ষ অন্য পক্ষের দিকে যেতে বলেন। এ চরের মানুষের দুর্ভোগ শেষ হবে না?

স্থানীয় চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শেখ ফরিদ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইব্রাহিম খলিল দিদার বলেন, এ চরটি মূলত রামগতি উপজেলার আওতাধীন। চরে বসবাসকারী সবাই রামগতি উপজেলার ভোটার। কিন্তু হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর পালিত জলদস্যু ও ডাকাত বাহিনী চরটিতে একক আধিপত্য বিস্তার করে দখলে নিতে চেয়েছিল। আদালতে দায়ের করা মামলায় বয়ারচর রামগতি উপজেলার অংশ হিসেবে রায় দেয়। চরটি নিয়ে রামগতির নেতারাও অনেক রাজনীতি করেছেন। নির্বাচন আসলে বয়ারচরে এসে সব দিয়ে দেয়। নির্বাচন গেলে নেতাদের আর খবর নেই। উল্টো বয়ারচরের সীমানা জটিলতা জিইয়ে রাখতে কাজ করেন তারা। এতে এ চরের লাখো মানুষের মানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণ হচ্ছে।

চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাওহীদুল ইসলাম সুমন বলেন, বয়ারচরের বেশীরভাগ বাসিন্দারা রামগতির ভোটার। তাদের চলাফিরাসহ সবকিছু রামগতির সাথে। বয়ারচর অতিক্রম করে মেঘনা নদী পাঁড়ি দিয়ে নদীর ওপাড়ে রয়েছে হাতিয়া। কিন্তু তারা নদী পাঁড়ি দিয়ে বয়ারচরে এসে একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে এ সমস্যা সৃষ্টি করে রেখেছে। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের হুইপ ও লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান ও নায়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের এমপি আব্দুল হানান মাসুদ চরের সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তারা উভয়ে একটি বৈঠকও করেন। এতে দীর্ঘ ৩০ বছরের আটকে থাকা এ সমস্যা সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।

রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান বলেন, ওই এলাকাটি একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অঞ্চল। বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর ব্যাপক উৎপাত থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেনপুলিশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া হাতিয়া ও রামগতি উভয়ে এলাকাটির দাবিদার। বিষয়টি সমাধান হলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে বয়ারচরে এ সমস্যা বিদ্যমান। সমস্যাটি সমাধানে অতীতে অনেকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এবার আশা করছি একটা সমাধান পৌঁছাতে পারবো। ইতিমধ্যে হাতিয়ার বর্তমান এমপির সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনিও বিষয়টি সমাধানের জন্য আন্তরিক আছেন। এনিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হব।

Tag :
লেখকের তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে : রাষ্ট্রপতি

রামগতিতে সীমানা জটিলতায় নাগরিক সেবা বঞ্চিত লক্ষাধিক মানুষ

আডেট সময় ১০:৪৯:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

আমানত উল্যাহ, রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর): লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল ‘বয়ারচর’। প্রাকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে বাস করলেও এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন সংগ্রামে ভরা। প্রতিনিয়ত নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের। লক্ষাধিক মানুষের বসবাসের এ চরটি নিয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া ও লক্ষ্মীপুরর রামগতি উপজেলার সীমানা নিয়ে রয়েছে মামলা-মোকদ্দমা। এ সীমানা জটিলতার অজুহাতে আইনী, মানবিক ও নাগরিক সেবা বঞ্চিত বয়ারচরবাসী।
সরেজমিন ঘুরে চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ জনপদের সীমানা জটিলতা থাকায় কোনো ভালমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিরক্ষর তৈরী হচ্ছে এখানে। একেকটি ওয়ার্ডে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার মানুষ বসবাস করলেও বেশিরভাগ ওয়ার্ডে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। লাখো মানুষের বসবাসের এ চরে নেই কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্রও।

বয়ারচরের দুই দিকে মেঘনা নদী। আর এক দিকে ভুলুয়া নদী। মাঝখানে রামগতি উপজেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী। যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর। কোনো প্রসূতি মা অসুস্থ হলে ২০ কিলোমিটার পাঁড়ি দিয়ে নিতে হয় রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকেও বিচ্ছিন্ন এ চরটি। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময়ে চরটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত। চরের মাঝে অসংখ্য কাঁচা সড়ক থাকলেও এলাকাটি নিয়ে মামলা থাকায় হাতিয়া ও রামগতি উপজেলার কেউ উনয়নমূলক প্রকল্প দিতে আগ্রহী নয়। দু’উপজেলার ঠেলাঠেলিতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত বয়ারচরবাসী। রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্টের অবস্থা একেবারেই নাজুক। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চরটিতে আধিপত্য বিস্তার করছেন একাধিক দস্যুবাহিনী। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ এ চরের নিত্য দিনের ঘটনা।

চরের বাসিন্দারা জানান, বয়ারচরে জলদস্যু, ভূমিদস্যু ও একাধিক ডাকাত বাহিনীর অত্যাচার বন্ধ এবং এলাকাটির স্থায়ী সমাধানের দাবিতে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে আসছেন। তবে , ২০০৭ সালের দায়ের করা মামলায় উচ্চ আদালতে রামগতির পক্ষে রায় হলেও রামগতি উপজেলা প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা বয়ারচরকে অবহেলা করেই চলছে। সরিয়ে নেন দু’টি পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের। বন্ধ করে দেন নাগরিক অধিকার ও মানবিক সহায়তা। মনে হচ্ছে , বয়ারচরকে হাতিয়ার দিকে ইচ্ছা করেই ঠেলে দিচ্ছে তারা। এতে চরের বাসিন্দারা অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন।

তারা জানান, বয়ারচরে যাওয়ার একমাত্র ভরসা নৌপথ ও একটি সড়কপথ। বর্ষা মৌসুমে নদীর উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয় তাদের। জরুরি প্রয়োজনে বিশেষ করে অসুস্থতা বা প্রসবকালীন পরিস্থিতির সময় মূল ভু-খন্ডে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বয়ারচর ব্রিজঘাট এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান জানান, বয়ারচরে দুইটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও ফাঁড়ি দুটিতে কোনো পুলিশ থাকে না। রাজনৈতিক হানাহানি ও চরের একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে জলদস্যু, ভূমিদস্যু, সক্রিয় ডাকাতবাহিনী ও দালাল চক্রের হাতে জিম্মি এ চরটি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণহীন সম্পূর্ণ অরক্ষিত এ চরটির লাখো মানুষ রয়েছে নিরাপত্তাহীনতায়। স্থানীয়রা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে। অজুহাত সীমানা বিরোধ। কিন্তু আদালত রামগতির পক্ষে রায় দিলেও রামগতির রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসন অনেকটা অনীহা ভাব দেখাচ্ছে। অন্যদিকে, বয়ারচরের দুইদিক থেকে ভাঙছ নদী। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত এ চরটিতে বসবাসকারীরা চাচ্ছেন স্থায়ী সমাধান।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালে তৎকালীন লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের এমপি আব্দুল্লাহ আল মামুন ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের এমপি মোহাম্মদ আলী বয়ারচরের সীমানা জটিলতা নিরসনের জন্য দুই জেলা প্রশাসক নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করেও সমাধানে পৌঁছাত পারেননি।

বয়ারচরের তেগাছিয়া এলাকার বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক শরীফ মাহমুদ বলেন, এ চরটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল। আমাদের দু’পাশে দুই উপজেলা। রামগতি ও হাতিয়া। সীমানা জটিলতার অজুহাতে প্রশাাসন আমাদের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। এতে সব ধরনের নাগরিক ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।হচ্ছে বয়ারচরের মানুষ।
তিনি বলেন, বয়ারচরের মানুষ অবহেলিত। আমরা আইনী ও নাগরিক অধিকার পেতে রামগতি গেলে তারা বলে তোমরা হাতিয়া যাও। আবার হাতিয়ায় গেলে বলা হয় তোমরা রামগতির ভোটার সেখানে যাও। এ মারপ্যাচে সব ধরনের আইনী ও নাগরিক অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত।

সেখানকার আরেক বাসিন্দা মো. মামুন বলেন, বাংলাদশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মূল্য থাকলেও আমাদের তাও নেই। কোনো ঝামেলা হলে দুই উপজেলা পরিষদ ও থানায় গেলে কোনো মূল্য পাওয়া যায় না। তারা এক পক্ষ অন্য পক্ষের দিকে যেতে বলেন। এ চরের মানুষের দুর্ভোগ শেষ হবে না?

স্থানীয় চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শেখ ফরিদ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইব্রাহিম খলিল দিদার বলেন, এ চরটি মূলত রামগতি উপজেলার আওতাধীন। চরে বসবাসকারী সবাই রামগতি উপজেলার ভোটার। কিন্তু হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর পালিত জলদস্যু ও ডাকাত বাহিনী চরটিতে একক আধিপত্য বিস্তার করে দখলে নিতে চেয়েছিল। আদালতে দায়ের করা মামলায় বয়ারচর রামগতি উপজেলার অংশ হিসেবে রায় দেয়। চরটি নিয়ে রামগতির নেতারাও অনেক রাজনীতি করেছেন। নির্বাচন আসলে বয়ারচরে এসে সব দিয়ে দেয়। নির্বাচন গেলে নেতাদের আর খবর নেই। উল্টো বয়ারচরের সীমানা জটিলতা জিইয়ে রাখতে কাজ করেন তারা। এতে এ চরের লাখো মানুষের মানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণ হচ্ছে।

চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাওহীদুল ইসলাম সুমন বলেন, বয়ারচরের বেশীরভাগ বাসিন্দারা রামগতির ভোটার। তাদের চলাফিরাসহ সবকিছু রামগতির সাথে। বয়ারচর অতিক্রম করে মেঘনা নদী পাঁড়ি দিয়ে নদীর ওপাড়ে রয়েছে হাতিয়া। কিন্তু তারা নদী পাঁড়ি দিয়ে বয়ারচরে এসে একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে এ সমস্যা সৃষ্টি করে রেখেছে। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের হুইপ ও লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান ও নায়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের এমপি আব্দুল হানান মাসুদ চরের সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তারা উভয়ে একটি বৈঠকও করেন। এতে দীর্ঘ ৩০ বছরের আটকে থাকা এ সমস্যা সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।

রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান বলেন, ওই এলাকাটি একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অঞ্চল। বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর ব্যাপক উৎপাত থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেনপুলিশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া হাতিয়া ও রামগতি উভয়ে এলাকাটির দাবিদার। বিষয়টি সমাধান হলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে বয়ারচরে এ সমস্যা বিদ্যমান। সমস্যাটি সমাধানে অতীতে অনেকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এবার আশা করছি একটা সমাধান পৌঁছাতে পারবো। ইতিমধ্যে হাতিয়ার বর্তমান এমপির সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনিও বিষয়টি সমাধানের জন্য আন্তরিক আছেন। এনিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হব।