স্টাফ রিপোর্টার: লক্ষ্মীপুর জেলাজুড়ে এবার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এক লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে। সরকারের নানামুখী আশ্বাস আর প্রশাসনের ‘সব ঠিক আছে’ তদারকিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাঠ পর্যায়ে চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে, আর কোথাও কোথাও ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। চরম ক্ষোভে ও হতাশায় জেলার বিভিন্ন স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের রামনগর মাদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসায়। বিপুল উৎসাহ নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ১৫০টি চামড়া শেষ পর্যন্ত কোনো পাইকারি ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ।
মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রমিক ও গাড়ি ভাড়া দিয়ে চামড়াগুলো সংগ্রহ করতে তাদের হাজার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু দিনভর অপেক্ষা করেও কোনো আড়তদারের দেখা মেলেনি। তীব্র গরমে চামড়া পচতে শুরু করলে পরিবেশ রক্ষায় সেগুলো মাটিচাপা দিতে বাধ্য হন তারা। এতে মাদরাসার এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের ফান্ডের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু চন্দ্রগঞ্জ নয়—লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার চিত্রও প্রায় একই।
জেলা শহরের অলিগলিতে চামড়া নিয়ে বসে থেকেও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি। পানির দরে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। রায়পুর ও রামগঞ্জ দুই উপজেলায় লবণের আকাশচুম্বী দাম আর শ্রমিকের চড়া মজুরির কারণে সাধারণ মানুষ ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বড় আড়তদারদের বেঁধে দেওয়া সিন্ডিকেট মূল্যের বাইরে কেউ চামড়া কিনছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। রামগতি ও কমলনগর উপকূলীয় এই দুই উপজেলায় যাতায়াত খরচ বাড়ায় পাইকারি ক্রেতারা গ্রামগঞ্জে যাননি। ফলে বহু চামড়া অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেকেই নামমাত্র ১০০-১৫০ টাকায় গরু ও আর খাসির চামড়া মোটেই বিক্রি হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আড়তদাররা আগেভাগেই জোট বেঁধে দাম কমিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে, চামড়া সংরক্ষণের প্রধান অনুষঙ্গ লবণের বাজার ছিল নিয়ন্ত্রণহীন। ফলে লোকসানের ভয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এবার চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ দেখাননি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর ওপর, যারা প্রতি বছর চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে এতিমদের ভরণপোষণ চালায়।
চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা চামড়া পুঁতে ফেলার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। অথচ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, চামড়া সংরক্ষণে পর্যাপ্ত লবণের মজুদ ও বাজার তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে।
বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রশাসনের ‘কাগুজে তদারকি’ আর মাঠ পর্যায়ের চিত্রের মধ্যে ব্যবধান আকাশ-পাতাল। যখন এতিমদের হকের চামড়া মাটির নিচে চলে যাচ্ছে, তখন প্রশাসনের এমন ‘অজ্ঞতা’ সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রান্তিক পর্যায়ে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতি বছরই জাতীয় সম্পদ এভাবে অপচয় হচ্ছে। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এবং সরকারিভাবে জেলা পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা (কোল্ড স্টোরেজ বা ডাম্পিং স্টেশন) না করলে লক্ষ্মীপুরের মতো এমন ঘটনা দেশের অন্যান্য প্রান্তেও মহামারি আকার ধারণ করবে।
মেঘনার তীর 


















